সে যুগে ভ্যালেন্টাইন ডে ছিলো না। ছিলো না সোসাল মিডিয়া। পূজাটা তাই আমাদের কাছে একমাত্র বড়ো সুযোগ প্রিয় মানুষটাকে মনের কথা বলার। তাই প্রেম বন্ধনে ছেলেরা মেয়েদের বেধে ফেলতো পূজার পুণ্য লগ্নে , আর এই পূজাতে প্রেম করার মজাই আলাদা। হয়তো বা শুভ কাজে দেব দেবীদের আশীর্বাদ থাকলে তা অচিরেই পায় পরিণতি। এই কারণেই বোধয় সেকালে দূর্গা পূজা আর সরস্বতী পূজা বাঙালিদের জন্যে নিছক একটি ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে চলার গুরুগম্ভীর কোনও দিন নয়। প্রেম পড়ার উৎসব ছিলো।
কিন্তু আমি দুই বছর ধরে চার সুযোগ হাতছাড়া করে শেষ মহালায় রাত পিকনিক না করে। পিউর জন্য একটা চিঠী লিখলাম।
বুকের মধ্যে কত উত্তেজনা নিয়ে সাতদিন চিঠীটাকে কত বার পড়লাম কতবার নতুন করে লিখলাম ঠিক নেই । কিন্তু ষষ্ঠী তে সে এলো না মন্ডপে। খোঁজ খবর করে জানাম ওর গ্রুপের সব মেয়েরা প্রেম করছে। তাই এবছর ও মন্ডপে এসে কি করবে তাই আসে নি। ফন্দি করে তাই আমি ঠিক করলাম সপ্তমী দিন কুইজ প্রতিযোগিতা রাখা হবে। কাজ হলো ও এলো। ছোট্টুকে একটা চকলেট ঘুস দিয়ে । ছোট্টুর হাত দিয়ে একটা ক্যাডবেরি আর চিঠিটা হাতে দিলাম।
অষ্টমী সকালে সুন্দর শাড়ি পড়ে, এলো অঞ্জলি দিলাম এক সাথে। কিন্তু চিঠির উত্তর জানতে চাইলে বললো।" আমার প্রিয় সাবজেক্ট অঙ্ক। কিন্তু পাটিগণিত করতে একটুও ভালো লাগে না কারণ বেশি পড়তে হয়। ওতো ইতিহাস নোট মতো কিছু একটা দিলো। অতো পড়বো কি করে। বাবা শরৎচন্দ্রের দেবদাস এনে দিয়েছে, ওটাই পড়ার সময় পাচ্ছি না। ছোট করে লিখে দিও পড়ে দেখবো। আর আমি ডার্ক চকলেট খাই না। মিল্কি বার দিও। আর বিকালে দিলে কর্নেটো আইসক্রিম দিও। "
মনে মনে রাগ হলো ভীষণ ।দুই বছর তিন বছর ধরে , চোখে চোখে কথা, মিষ্টি হাসি ছোড়া ছুড়ি, ছাদে এলে ওকে দেখতে গিয়ে ক্যাচ মিস কত করিছি, কতবার আউট হয়ে গেছি। ও ওর বান্ধবীরা হাসাহাসি করে সেই নিয়ে, সব কিছু জেনে আজ না জানার ভান করছে। তিন বছর ধরে ঘুরপাক খাচ্ছি। এখন আমাকে ঘোল খাইয়ে, মিলকিবার আইসক্রিম খেতে চাওয়া। পরে শান্ত হয়ে ভাবলাম ঠিক আছে ছোট করে লিখি একটা চিঠি। কিন্তু সারা দুপুর বসে ছোট একটা চিঠি লিখতে পারলাম না। সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে বেড়ানো হলো না আর। রাতবেলায় দেখি পিউ হাজির আমাদের বাড়ি। ওর কোন অঙ্কেল বাড়ির নবরাত্রি পূজায় নয়টা কুমারী মেয়ে লাগবে তাই আমার কাকার মেয়েকে নিয়ে যাবে ও। যাইহোক মা আমার ওপর দায়িত্ব দিলো।ওদের দিয়ে আসা নিয়ে আসার।
পথে ও আমাকে বললো " তুমি এতো কিপটা জানতাম না। মিল্ক বার খাওয়ানোর ভয় আজ পেন্ডলএই এলে না। "
আমি বললাম " এখুনি খাওয়াছি, "
ও বললো" না থাক আজ, অনেক প্রসাদ খেয়েছি। কাল বিকালে, আমাকে আর তোমার বোনকে নিয়ে পাল পাড়ার ঠাকুরটা দেখিয়ে নিয়ে এসো তাহলেই হবে। তখন না হয় চকলেট সাথে কি একটা দিয়ে ছিলে দিও। "
যাইহোক বিকালে গেলাম ঘুরতে ওদের নিয়ে বরং ঐ আমাকে ফুচকা খাওয়ালো। চিঠিতে সব কথা লিখতে পাববোন আমি বলে দিলাম। ও এক ঘণ্টা সময় দাড়িয়ে থাকলো আমার সামনে আমতা আমতা করে গেলাম , কিন্তু কিছু তেই আমি তোমাকে ভালোবাসি কথাটা বলতে পারলাম না ওর চোখে চোখ রেখে।
বিসর্জন হয়ে গেলো। বন্ধুরা আসেছে বছর আবার হবে আবার হবে বলে আমাকে খচাচ্ছিলো। আর বললো মিষ্টি খেয়ে মিষ্টি মুখ কর, তোর দ্বারা কিছু আর হবে না। সব কথা ও বসে বসে শুনছিলো। হঠাৎ ও আমার দিকে হেটে এলো। বললো " এই শোনো এদের সবার সামনে, এখুনি যদি আমাকে আই লাভ ইউ না বলতে পারো, তাহলে তোমার খবর আছে। আমাকে দেওয়া চিঠি টা তোমার বাবার হাতে দিয়ে আসবো। আর বলবো ছেলেকে আর কলেজ পাঠিয়েন না। 1277 টা শব্দ, 233টা বাক্য লিখতে গিয়ে 308 বার কেটেছে, আর 128 বানান ভুল করেছে। একে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ালে একটা বাড়িও বাড়ি থাকবে না।
আই লাভ ইউ বলবে কি , বলবে না বললো নয় যাচ্ছি তোমার বাবা মায়ের কাছে। "
ধমক খেয়ে ওর পায়ে লুটিয়ে পড়ে বললাম" আই লাভ ইউ পিউ"
বন্ধুরা চিৎকার করে বললো " ওর পায়ে লুটিয়ে পরে কেউ আই লাভ ইউ বললে না। বুকে জড়িয়ে বলল। "
পিউ বললো " সাধে কি পা ধরছে, চিঠি তিন টে জেরক্স করে পলন্ট দা, রঞ্জন কাকু, খগেন পিসোকে দিলে , ওকে মেরে পোস্টার করে দেবে, পাড়ার মেয়েদের খারাপ চোখে দেখা, বেড়িয়ে যাবে। বলে সুস্মিতা দেবীর থেকে তোমার পেটটা সুন্দর, শর্মিলা দেবী মতো সুন্দর চোখে, অপর্ণা দেবীর মতো তোমার হাসি। "
আমি তাং করে লাফিয়ে বললাম। " আমি শর্মিলা বৌদি, সুস্মিতা দিদি, অপর্ণা পিসি কেন, কোন মেয়ে দিকে তাকিয়ে না কখনো, আমি শর্মিলা ঠাকুর, সুস্মিতা সেন আর অপর্ণা সেনের সাথে তুলনা করেছিলাম "
ও বললো " কিন্তু তুমি কার পারমিশন আমার পেট দেখেছো সেটা আগে বললো?? "
উত্তর না দিতে পরে চুপ করে গেলাম, কিভাবে চলতে হবে, কি করতে হবে, তাঁর একটা বড় সড় শর্তাবলী নিয়ে, ও অনর্গল কথা বলতে থাকলো। ,,,
, ,,
পূজায় প্রেম
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
44
Views
0
Likes
0
Comments
0.0
Rating