কাঠগোলাপের ঘ্রাণ

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
(১)

রোদের ঝিকিমিকি আলোয় সকালটা বেশ ঝলমলে লাগছিল। চট্টগ্রাম শহরের ব্যস্ত রাস্তাগুলোতে তখন গাড়ির হর্ণ, মানুষের চিৎকার আর ভ্যাপসা গরমে এক অস্থির পরিবেশ। তার মাঝেই শান্ত, নিরালাভাবে দাঁড়িয়ে ছিল পুরান কাপাসগোলা এলাকার একটা চারতলা বিল্ডিং। সাদা রং চটে গিয়ে ফিকে হয়ে গেছে, বারান্দার কোনায় একগুচ্ছ কাঠগোলাপ ফুল ছড়িয়ে পড়ে আছে। যেন বাড়িটার ভেতরে কেউ এখনো ফুল ফোটাতে জানে, কেউ এখনো হৃদয়ে বাস করে।

তৃতীয় তলার পূর্ব পাশের ফ্ল্যাটে থাকে রাইসা। চট্টগ্রাম কলেজে পড়ে, অনার্সে বাংলা সাহিত্য নিয়ে। মা-বাবার একমাত্র মেয়ে, কিন্তু জীবন তার খুব গুছিয়ে দেয়নি কিছুই। বাবা, মোহাম্মদ হানিফ, ছিলেন সরকারি অফিসার। বছর ছয়েক আগে স্ট্রোক করে চলে যান। মা, শাহিদা খাতুন, স্কুলশিক্ষিকা ছিলেন, এখন পেনশনে, অল্প কিছু টিউশন করে সংসার চালান।

রাইসার চোখে এক ধরনের নিরব বিষাদ লেগে থাকে। কলেজে সবাই তাকে ভদ্র, শান্ত আর কিছুটা অন্তর্মুখী বলে জানে। তবে কেউ জানে না, তার বুকের ভিতরে এক অন্যরকম কষ্ট জমে আছে—একটা গল্প, যা সে কাউকে কখনো বলে না।

তবে এই নিস্তরঙ্গ জীবনে হঠাৎ একদিন ঢেউ তোলে আরেকজন—নাম রিফাত হায়দার। নতুন বাসিন্দা, নিচতলার ডান পাশের ফ্ল্যাটে উঠেছে মাত্র এক সপ্তাহ হলো। ঢাকার ছেলে, পরিবার নিয়ে চট্টগ্রামে এসেছে চাকরির কারণে। ইউনিভার্সিটি শেষ করে একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ হিসেবে যোগ দিয়েছে। ছেলেটা প্রাণবন্ত, চটপটে, মিষ্টি হেসে কথা বলে। পাশের বাসার বয়স্ক আংকেল-আন্টিদের সঙ্গেও দেখা হলেই সালাম দেয়, কথা বলে।

রাইসার সঙ্গে তার দেখা হয় বারান্দার কাঠগোলাপ ফুলের কাছে। একদিন সকালে মা কাজের বাইরে গেছেন, রাইসা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল বই হাতে। হঠাৎ নিচ থেকে আওয়াজ এলো,
“আপু! কাঠগোলাপ ফুলটা পড়ে গেছে, একটু ছুঁড়ে দিবেন?”

রাইসা অবাক হয়ে তাকালো নিচে। রিফাত, সাদা পাঞ্জাবি আর জিন্স পরে দাঁড়িয়ে, মুখে শিশুসুলভ হাসি। সে কিছু না ভেবে ফুলটা ছুঁড়ে দিল। রিফাত সেটা হাতে নিয়ে গন্ধ শুঁকে বলল,
“আপু, এই ফুলটার ঘ্রাণেই তো মনটা ভালো হয়ে যায়!”

রাইসা মৃদু হাসল। অনেকদিন পরে এমন করে কেউ তার মুখে হাসি ফুটালো।

তারপর থেকে ধীরে ধীরে কথাবার্তা শুরু হলো। রাইসা সাধারণত ছেলেদের সঙ্গে মিশত না, তবে রিফাত আলাদা। তার কথায় একটা আন্তরিকতা ছিল, যেন কোনো লুকোছাপা নেই। সে রাইসার মায়ের সঙ্গেও কথা বলে, বাজার থেকে কিছু আনতে গেলে সেও কিছুটা সাহায্য করে। যেন ছোট ছোট ছোঁয়ায় জায়গা করে নিচ্ছিল রাইসার জীবনে।

একদিন বিকেলে হঠাৎ বৃষ্টি নামে। রাইসা বারান্দায় দাঁড়িয়ে, চুল ভিজে যাচ্ছে, গালে বৃষ্টির ফোঁটা। হঠাৎ নিচ থেকে রিফাত ডাকে,
“আপু, ভিজবেন না, ঠান্ডা লেগে যাবে।”

রাইসা বলে, “ভিজতেই তো ভালো লাগে। মাঝে মাঝে ভিজতে ইচ্ছে করে।”
রিফাত হেসে বলে, “তাহলে আমিও আসি?”

তারপর তারা দু’জন একসঙ্গে বৃষ্টিতে ভিজে না, কিন্তু গল্প করে। রিফাত বলে তার ছোটবেলার কথা, ঢাকার গলির স্মৃতি, মায়ের রান্না, বাবার গম্ভীর চেহারা। রাইসা বলে তার বাবার মৃত্যুর কথা, কলেজের বন্ধুদের কথা, তার প্রিয় লেখক জীবনানন্দ দাশের কবিতার কথা।

রাইসা বোঝে, রিফাতকে ভালো লাগছে তার। একটু একটু করে, নিঃশব্দে। কোনো আড়ম্বর নেই, তবু হৃদয়ের অলিন্দে যেন একটা নতুন অনুভব জমে উঠছে।

একদিন সন্ধ্যায় রিফাত তাকে বলল,
“আপু, আপনি কি জানেন কাঠগোলাপ ফুলের মানে কী?”
রাইসা বলল, “না, কী?”
“এটা নাকি একরকম নিঃসঙ্গ ভালোবাসার প্রতীক। যারা প্রিয় মানুষকে পায় না, তাদের হৃদয়ে এই ফুল ফোটে।”

রাইসা মৃদু হাসে, মুখে বলে না কিছু। কিন্তু মন বলে, “আমার হৃদয়েও তাহলে কাঠগোলাপ ফোটে রিফাত…”

পরদিন কলেজ থেকে ফিরে এসে দেখে দরজার পাশে একটা কাঠগোলাপ ফুল রেখে গেছে কেউ। কাগজে ছোট করে লেখা—

“আজ সকালে আপনার বারান্দায় ফুল ফুটেছিল, কিন্তু আপনি ছিলেন না। তাই রেখে গেলাম, এইটুকু ঘ্রাণে আপনি আমায় মনে রাখুন।”

নাম লেখা নেই, তবু বুঝতে অসুবিধা হয় না।

এরপর থেকে প্রতিদিন সকালে একটা করে কাঠগোলাপ ফুল রাইসার দরজার পাশে পাওয়া যায়। সে রাখে, গন্ধ শোঁকে, বুকের ভেতরে একরকম কাঁপন লাগে। কিন্তু মুখ ফুটে বলে না কিছু।

একদিন বিকেলে রিফাত জানাল, “আমার বদলি হয়েছে। কোম্পানি আমাকে ঢাকায় হেড অফিসে পাঠাচ্ছে। রওনা দিতে হবে আগামী সপ্তাহে।”

রাইসার মুখ কালো হয়ে যায়। কিন্তু সে কিছুই বলে না। কেবল বলে, “ভালো থাকবেন।”
রিফাত বলে, “আপনার জন্য কিছু রেখে যাব।”
সে মৃদু হেসে বলে, “কী?”
রিফাত চোখ মেলে বলে, “আপনার দরজার পাশে রেখে যাবো—একটা কাঠগোলাপ ফুল। প্রতিদিন না হলেও, অন্তত শেষ দিন তো রাখতেই হবে, তাই না?”

রাইসা মাথা নিচু করে, মুখে কোনো শব্দ নেই।

সপ্তাহ ঘুরে যায়, চলে যাওয়ার দিন সকালে রাইসা দরজা খুলে দেখে—একটা কাঠগোলাপ ফুল। সঙ্গে একটা চিঠি।

“আপু, আমি রিফাত না, আপনার রাইসা। এই নামে আপনি ডাকতেন না কখনো, কিন্তু এই নামেই আপনাকে লিখে রাখলাম। আপনি যদি কখনো ঢাকা আসেন, পুরান ঢাকার লালকুঠির মোড়ে একটা ছোট চা-দোকানে এসে দাঁড়াবেন। আমি রোজ সন্ধ্যায় সেখানে থাকি। কাঠগোলাপের ঘ্রাণে একদিন আপনাকেও ফিরে পাব—এই বিশ্বাস রাখি।”

চিঠি হাতে রাইসা কাঁদে। প্রথমবারের মতো, অবলীলায়। মা কিছু না বুঝে পাশে এসে বলে, “কী হয়েছে মা?”
সে কেবল বলে, “মা, একটা কাঠগোলাপ ফুল… আমি বুঝিনি, এটা এত কিছু বলতে পারে…”

সময় যায়। রিফাতের চলে যাওয়ার পর রাইসা আরো গম্ভীর হয়, ক্লাস করে, টিউশনি নেয়, মাঝে মাঝে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে কাঠগোলাপের কাছে। মাঝে মাঝে চিঠিটা পড়ে। তবু যায় না মন থেকে সেই সন্ধ্যার কথা, সেই চা-দোকানের মোড়ে যাওয়ার ইচ্ছা।

একদিন কলেজ বন্ধ, সে হঠাৎ মা-কে বলে, “মা, ঢাকা যাবো। একটা চাকরির ফর্ম জমা দিতে হবে।”
মা অবাক, “তুই তো চাকরি করতে চাস না?”
সে মৃদু হাসে, “চেষ্টা তো করতেই পারি। একটা গল্প শেষ করা বাকি, মা।”

ঢাকায় এসে সে খোঁজে সেই লালকুঠির মোড়। সন্ধ্যার সময়, পুরান ঢাকার গলি, পাশে কিছু ইটের চায়ের দোকান, কয়েকটা ল্যাম্পপোস্টে হালকা আলো। হঠাৎ চোখে পড়ে চায়ের দোকানের পাশে বসে আছে রিফাত, মাথা নিচু করে মোবাইলে কী যেন করছে।

রাইসা চুপিচুপি এগিয়ে যায়। তার চুলে কাঠগোলাপ গুঁজে আছে, হাতে বই, চোখে আত্মবিশ্বাস। রিফাত তাকিয়ে হঠাৎ বলে উঠে, “আপু?”

রাইসা হাসে। বলল না কিছু, শুধু হাতে থাকা কাঠগোলাপ ফুলটা তার সামনে বাড়িয়ে দিল।

সন্ধ্যার হাওয়ায় হালকা কাঠগোলাপের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। দুজন দাঁড়িয়ে থাকে কিছু না বলে। যেন একটা গল্প আবার শুরু হতে চলেছে—তবে এবার শব্দ ছাড়াই।


_____________________


(২)


রাতের হালকা হাওয়ায় কাঠগোলাপের ঘ্রাণ আরও প্রবল হয়ে উঠছিল। পুরনো ঢাকার সেই ছোট্ট চা-দোকানটিতে রাইসা আর রিফাত দাঁড়িয়ে ছিল একে অপরের দিকে তাকিয়ে। দুজনের চোখে ছিল অনেক কথা, অনেক অনুভূতি, যা ভাষায় প্রকাশের অপেক্ষা করছিল।

রিফাত ধীরে ধীরে বলল, “আপু, আমি জানি সময় আমাদের দূরে ঠেলে দিয়েছে। কিন্তু আজ তোমাকে দেখতে পেয়ে মনে হচ্ছে, সব কষ্ট যেন মিথ্যে হয়ে গেছে। তুমি কি বিশ্বাস করবে, আমরা আবার শুরু করতে পারি?”

রাইসার চোখে জল ঝলমল করে উঠল। সে বলল, “রিফাত, তোমাকে হারিয়ে আমার জীবনে অনেক শূন্যতা ছিল। কিন্তু আজ আমি চাই, পুরনো ভুলগুলো ভুলে আমরা নতুন করে গড়ি আমাদের জীবন।”

রিফাত মৃদু হাসলো, “তুমি জানো, কাঠগোলাপের ঘ্রাণ শুধু নিঃসঙ্গ ভালোবাসার প্রতীক নয়, বরং একরকম আশা ও ধৈর্যের প্রতীক। এই ঘ্রাণ আমাদের ভালোবাসাকে আরও মধুর করে তুলবে।”

রাইসা মাথা হেলিয়ে বলল, “হ্যাঁ, আমাদের ভালোবাসা যেন সেই কাঠগোলাপের মতো—কোকিল গানের মতো কোমল, মিষ্টি আর দীর্ঘস্থায়ী।”

দুজন তখন হালকা চায়ের কাপ হাতে নিয়ে একটু সময় কাটাল, পুরান স্মৃতিতে ডুবে।

এরপর কিছুদিন তারা একসঙ্গে কাটাল, অনেক কথা বলল, অনেক সুখ-দুঃখ ভাগ করল। রিফাতের বদলি হলেও তারা যেন একসঙ্গে এক নতুন শহর, এক নতুন জীবনের সূচনা করল।

কয়েক মাস পর রিফাতের মা ও বাবা ঢাকায় এলেন। রাইসার মা ও বাবার সঙ্গে তাঁদের বন্ধুত্ব হয়ে গেল। সবাই বুঝতে পারল, দুজনের ভালোবাসা কতটুকু গভীর।

এক সন্ধ্যায় রিফাত তার পকেট থেকে ছোট্ট একটা বাক্স বের করল। বাক্স খুলে রাইসা দেখল একটি মোমের আঙটি, যেখানে কাঠগোলাপের ছোট্ট কাঠের ছাঁচ বসানো।

রিফাত বলল, “এই আংটিটি আমাদের ভালোবাসার প্রতীক। যতদিন এটা থাকবে, আমাদের সম্পর্ক মধুর ও টেকসই থাকবে।”

রাইসা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমাদের ভালোবাসা যেন এই ঘ্রাণের মতো চিরন্তন হয়।”

সময় কেটে গেল। তারা বিয়ে করল, জীবনের প্রতিটি ভালো-মন্দ মুহূর্ত একসঙ্গে ভাগ করে নিল। তাদের সংসারে এসেছে একটি মেয়ে, যার নাম রাখল তারা ‘কাঠগোলাপ’। মেয়েটির হাত ধরে তারা ফিরে গেল সেই পুরনো এলাকার চারতলা বাড়িতে, যেখানে তাদের ভালোবাসার গল্প শুরু হয়েছিল।

কাঠগোলাপ ফুলের সেই নরম ঘ্রাণ চারপাশে ছড়িয়ে ছিল, যেন মনে করিয়ে দিচ্ছিল, সত্যিকার ভালোবাসা কখনো নিঃসঙ্গ হয় না, বরং সময় ও দূরত্বকে জয় করে আরো মধুর হয়।

রাইসা আর রিফাত একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাল। তারা জানতো, সামনে যা থাকুক না কেন, তারা একসঙ্গে সেই কাঠগোলাপের মতোই ফুল হয়ে থাকবে—বাতাসে মিশে থাকা একটি কোমল ঘ্রাণ।

গল্প এখানেই শেষ নয়, বরং নতুন এক অধ্যায়ের শুরু।


_______________________







সমাপ্ত..........................................
62 Views
3 Likes
0 Comments
5.0 Rating
Rate this: