কে ছিলো আড়ালে

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
কে ছিলো আড়ালে — পর্ব ৪
(আরাফের অতীতের অন্ধকার উন্মোচন, সম্পর্কের মেরামত, সমাজ ও পরিবারের চাপ মোকাবিলা)

ফজরের নামাজ শেষে রিমা সেজদায় দীর্ঘ সময় কেটে দিলো। চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছিল, কিন্তু মনে একটাই কথা—আজ আরাফকে সব খুলে বলাতে হবে। লুকোচুরির অবসান চাই।

দুপুরে, সবাই যখন যার যার কাজে ব্যস্ত, রিমা উঠোনের কোণে ডেকে নিলো আরাফকে। তার কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু দৃঢ়—
— “আরাফ, আমরা দম্পতি হয়েও পরস্পরের কাছে অচেনা থাকবো? আমি সত্য জানতে চাই। সবটা বলো, আমি আল্লাহর নামে বলছি, শোনার সাহস আমার আছে।”

আরাফ কিছুক্ষণ নীরব রইলো। তারপর গভীর শ্বাস নিয়ে শুরু করলো—

— “রিমা, আমি আগে এমন পথে ছিলাম যেখানে আল্লাহর ভয় ছিল না। খারাপ সঙ্গ, হারাম উপার্জন, মিথ্যা কথা—সব আমার জীবনের অংশ হয়ে গিয়েছিলো। আমি ভাবতাম টাকা থাকলেই জীবন সুন্দর। কিন্তু একদিন, হারাম লেনদেনের সাথে জড়িয়ে এমন এক ঘটনায় জড়িয়ে পড়লাম, যাতে আমার জীবনই ধ্বংস হয়ে যেতে পারতো। জেল এড়ালাম, কিন্তু পরিবারের কাছে মুখ দেখানোর সাহস হারালাম।”

রিমা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলো।

— “পালিয়ে গিয়ে একা থাকতাম শহরে। সেই সময় এক বৃদ্ধ ইমাম আমাকে আশ্রয় দেন। তিনি বলতেন—”

> “যে আল্লাহকে ভুলে যায়, সে নিজের আত্মাকেও হারিয়ে ফেলে। কিন্তু যে তাওবা করে, আল্লাহ তার অতীত মুছে দেন।”

— “সেদিন থেকে ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করি। হারাম ছেড়ে হালাল পথে চলি, নামাজ শুরু করি, কুরআন পড়তে থাকি। কিন্তু আমি ভেবেছিলাম, আমার অতীত তোমাকে জানালে তুমি হয়তো আমাকে ছেড়ে যাবে।”

রিমার চোখে জল এলো, কিন্তু কণ্ঠে ছিলো দৃঢ়তা। “যে আল্লাহ ক্ষমা করেছেন, তার বান্দাকে আমি কেন ক্ষমা করবো না? তবে আমাদের সম্পর্ককে শক্ত করতে হলে আল্লাহর পথে আরও দৃঢ়ভাবে চলতে হবে।”

তারা দুজন অঙ্গীকার করলো—
একে অপরের কাছে কোনো গোপন রাখবে না
প্রতিদিন একসাথে অন্তত এক ওয়াক্ত নামাজ জামাতে পড়বে
কুরআন ও ইসলামি শিক্ষা নিয়ে নিয়মিত আলোচনা করবে

পরিবারের সাথে আচরণে ধৈর্য ও উত্তম ব্যবহার করবযখন পরিবারে সত্য প্রকাশ করলো, সবার প্রতিক্রিয়া এক ছিল না। কেউ খুশি, কেউ আবার তিক্ত কথা বললো—
— “অতীত এত সহজে মুছে যায় না,” বললো আরাফের ছোট ভাই রফিক।
রিমা শান্তভাবে উত্তর দিলো—
— “অতীত আমাদের শিক্ষা দেয়, কিন্তু ভবিষ্যৎ আল্লাহর রহমতে বদলানো যায়।”
সে মনে করলো কুরআনের আয়াত—
❤️ "ওয়া মাই-ইত্তাকিল্লাহা ইয়াজআল্লাহু লাহু মাখরাজা।"
(যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য বের হওয়ার পথ করে দেন। — সূরা আত-তালাক: ২)❤️

গ্রামের কিছু মানুষ গুজব রটাতে লাগলো। কেউ বললো রিমা ভুল করছে, কেউ বললো এই সম্পর্ক টিকবে না। কিন্তু রিমা ও আরাফ একসাথে সব কথা সহ্য করলো।
তারা জানতো—প্রতিক্রিয়ার উত্তম জবাব হলো আমল ও আখলাক। তাই রিমা প্রতিবেশীদের খোঁজখবর নিতে লাগলো, সাহায্যের হাত বাড়ালো, আরাফ মসজিদের কাজে অংশ নিলো। ধীরে ধীরে মানুষ বদল দেখতে শুরু করলো।
এক রাতে, আরাফ ঘরে ঢোকার সময় দরজার ফাঁকে ভাঁজ করা একটা কাগজ পেলো। তাতে লেখা—
“তুমি বদলালে ঠিকই, কিন্তু তোমার অতীতের এক অংশ এখনো আড়ালে আছে… সময় আসছে।”

নিচে কোনো নাম ছিলো না। কাগজের কোণে হালকা শুকনো মাটির দাগ—যেন কারো কাদামাখা হাতের ছাপ।

রিমা কাগজটা হাতে নিয়ে বললো—
— “হয়তো এটা আবার তোমার পুরনো জীবনের কেউ। কিন্তু এবার আমরা লুকাবো না। সত্যকে সামনে আনবো, আর আল্লাহর ওপর ভরসা করবো।”

আরাফ প্রথমবারের মতো হেসে বললো—
— “হ্যাঁ, এবার আমরা একসাথে মুখোমুখি হবো।”

আকাশে তখন পূর্ণিমার আলো, কিন্তু তাদের জীবনে নতুন এক রহস্যের সূচনা হলো।

(চলবে — পর্ব ৫: গোপন প্রেরকের মুখোমুখি)

✍️ Ripon Khan ✍️
65 Views
1 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: