প্রেম_আমার
পর্ব_৯
কানিজ ফাতেমা
আরিয়ান ফোন ধরা মাত্রই তার ইনফর্মার তারেক তাকে বলল,
----- স্যার ঐ গাড়িটা কেউ জঘন্য ভাবে পুড়িয়ে ফেলেছে।তবে আমি যতটুকু খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি ওই গাড়িটা!!!!
কথাটা বলেই তারেক থেমে গেল। আরিয়ান কিছুটা রাগুন্বিত হয়ে বলল,
----- কি হলো থেমে গেলে কেন।ইউ নো আমি ভোনিতা করা একদম পছন্দ করি না।
তারেক আমতা আমতা করে বলল,
------স্যার ওই গাড়িটা আপনার বন্ধু রাফাত স্যারের।
কথাটা শুনে আরিয়ানের যেন হুঁশ করে গেল। আরিয়ান যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না কি শুনল সে।
------what rubbish.!কি যা তা বলছো তুমি এইসব।তুমি কি ঠিকভাবে খোঁজ নিয়েছো নাকি খোঁজ না নিয়েই আমাকে ইনফরমেশন দিচ্ছো।
------ না স্যার আমি একদম ঠিক বলছি। আমি যখন গাড়িটার খোঁজ নিয়েছিলাম তখন গাড়িটা একদম ঠিক ছিল। গাড়িটা একটা গ্যারেজে রাখা ছিল। আমি ভেবেছিলাম আগামীকালকে আপনাকে সেই গাড়ির কাছে নিয়ে যাবো।কিন্তু হঠাৎই খবর পাই গাড়িতে কেউ পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে।
------ ওকে তুমি ওই গ্যারেজের মালিকের সাথে বা লেবারের সাথে কথা বলে দেখো কোনো তথ্য পাও কি না।
------ স্যার মালিক এখানে থাকে না। যে এই গ্যারেজ টা দেখাশোনা করত হঠাৎ করেই করে সে মিসিং।কেউ তার খবর দিতে পারছে না সে কোথায় গেছে।
আরিয়ানের মাথা যেন গোল গোল করে ঘুরছে।আরিয়ান আর কোনো কথা না বলে ফোন কেটে দিল।আরিয়ানের মাথায় কিছুই ঢুকছেনা। এই সব কি হচ্ছে তার সাথে। রাফাতের গাড়িতে করে মাইশা কে কিডন্যাপ করতে চাইলো, রাফাত আবার ওর গাড়ির নাম্বারই আরিয়ানকে দিল।সেই গাড়িটা কেউ পুড়িয়ে ফেলল। যার কাছ থেকে ইনফরমেশন পাওয়ার একটু আশা ছিল সেই গ্যারেজের লোকটাও পর্যন্ত মিসিং। কোন কিছুরই হিসাব যেন মিলাতেই পারছে না আরিয়ান। তবে এই নিয়ে সকালেই রাফাতের সাথে তার কথা বলতে হবে তাহলে কিছুটা হলেও এর জট খুলবে। তবে মাইশা কে সব সময় আরিয়ানের চোখে চোখে রাখতে হবে। মাইশার কিছু হয়ে গেলে আরিয়ান একদম শেষ হয়ে যাবে।
পরদিন সকালে মাইশার ঘুম ভাঙতেই মাইশা কেমন যেন একটা মাথা ঝিমঝিম আর মাথায় ব্যথা অনুভব করল। মাইশা আস্তে আস্তে উঠে বসলো।মাইশা তার কপালে হাত দিতেই দেখল ওর কপালে ব্যান্ডেজ করা। মাইশা অনেকটা ঘাবড়ে গেল। মাইশার কিছুই মনে পড়ছে না কেন তার কপালে ব্যান্ডেজ করা আর সে কখন কিভাবে তার রুমে এলো। তার যতটুকু মনে আছে সে তো পার্টিতে ছিল আর কোল্ড ড্রিংকস খেয়ে ছিল তারপরে তার একটু মাথা ঝিমঝিম করছিল তারপরে আর কিছু মনে নেই মাইশার।মাইশা অনেকক্ষণ যাবৎ মনে করার চেষ্টা করল কিন্তু কিছুই মনে করতে পারল না।
তখনই মাইশার রুমে আলিয়া আসলো।
------ কিরে মাইশা এখন কি অবস্থা তোর।
------ ভালো। আচ্ছা আলিয়া আমি এখানে কি করে এলাম। আর আমার কপালে ব্যান্ডেজ করা কেন কি হয়েছিল আমার।
মাইশার কথা শুনে অনেকটা অবাক হলো আলিয়া।তবে আলিয়া এটা বুঝতে পারছে মাইশার কিছুই মনে নেই। আলিয়া একে একে সব কিছু বলল মাইশাকে।সব শুনে মাইশা কিছুক্ষণের জন্য থম মেরে রইল। মাইশা বুঝতে পারছে না কেন কেউ তার ক্ষতি করতে চাইছে। কি শত্রুতা তার মাইশার সাথে।কেন সে তার পিছনে পড়ে আছে।
আলিয়া মাইশাকে আলতো করে ধাক্কা দিয়ে বলল,
----- কিরে মাইশা কি ভাবছিস যা ফ্রেশ হয়ে আয়। মা টেবিলে নাস্তা দিচ্ছে তুই এলে একসাথে খাব।
আলিয়ার ডাকে ঘোর ভাঙ্গে মাইশার।মাইশা ফ্রেশ হতে চলে যায়। কিছুক্ষণ পর মাইশা নাস্তার টেবিলে যায়।
মাইশার মামি মাইশার দিকে নাস্তা এগিয়ে দিয়ে বলল,
------ কিরে মাইশা এখন ঠিক আছিস তো কালকে যে খেলটা দেখালি তুই। তোদের ইয়াং জেনারেশন এর এই একটাই দোষ পার্টিতে গেলে ওইসব খেতে হয় তোদের।
কথাটা গুলো শুনে মাইশা তার মামীর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তার মামী কি বলছে কিছুই বুঝতে পারছে না মাইশা। কি এমন করল মাইশা যে তার মামী তাকে এভাবে কথা শোনাচ্ছে।
আলিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো,
------ মা কি বলে যাচ্ছ তখন থেকে খেতে দাও তো।
তারপর ইশারা দিয়ে ওর মাকে থামতে বলল।
------ মামি তুমি এই ভাবে আমার সাথে কথা বলছ কেন কি করেছি আমি।
------ বাদ দে তো মাইশা। মা মজা করছিল মজা ও বুঝিস না তুই।
মাইশার মামি কোনো কথা না বলে কিছুটা রাগ দেখিয়ে ওখান থেকে চলে গেল।ওরা নাস্তা করতে শুরু করবে তখনই ওখানে আরিয়ান এল।
আরিয়ানকে দেখেই আলিয়া বলে উঠলো,
------ কিরে ভাইয়া তোর ঠোঁট ফুলে গেল কিভাবে আর তোর গলায় ঐ গুলো কিসের আঁচড়।
কথাটা শুনে আরিয়ান ভীষম খেলো।আরিয়ান দ্রুত ধক ধক করে এক গ্লাস পানি খেয়ে।আলিয়া কে জোরে একটা ধমক দিয়ে বলল,
------ খাবার সময় এত কথা বলিস কেন রে চুপচাপ খেতে পারিস না।
------ যা বাবা আমি আবার কি করলাম।আমি তো শুধু একটা কথা জিজ্ঞেস করলাম।
------ আর একটা কথাও না বলে চুপ চাপ খেয়ে ওঠ।
মাইশা ও ভালো করে খেয়াল করে দেখলো আরিয়ানের ঠোঁট টা ফুলে আছে আর গলায় কিছু আঁচড়ের দাগ।দেখে মনে হচ্ছে কারো নখের আঁচড়। মাইশার আর বুঝতে বাকি নেই।এই গুলো কিভাবে হলো।
'" আর কত মিথ্যে বলবে তুমি। আমার উপর খবরদারি দেখিয়ে অন্য মেয়ের জীবনে জরিয়েছো। ছেলেরা এমনি হয়।ওদের ভিতরে এক আর বাহির আর এক।(মাইশা মনে মনে)
কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই মাইশার চোখে পানি এসে জমা হলো। সবার নজর এড়িয়ে মাইশা চোখের পানিটা মুছে নিল। আরিয়ান তাড়াহুড়ো করে কোনরকমে নাস্তা করে চলে যাচ্ছিল তখনই আরিয়ানের মা পিছন থেকে ডাক দিয়ে বলল,
------ কিরে আরিয়ান তুই তো কিছুই খেলি না আর এতো তাড়াহুড়ো করে কোথায় যাচ্ছিস।
------ আমার একটু কাজ আছে মা।
আরিয়ান চলে যেতে নিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে মাইশা কে বলল,
------ মাইশা তুই সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তোর অফিসে যেতে হবে না। আমি অন্য কাউকে দিয়ে কাজগুলো করিয়ে নেব। আর হ্যাঁ আমার পারমিশন ছাড়া তুই এক পা ও বাহিরে কোথাও যাবি না।
কথাগুলো বলে আরিয়ান চলে গেল। মাইশার প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে আরিয়ানের কথা শুনে। মাইশা ভাবছে,
'"" তুমি নিজেকে খুব চালাক মনে করো তাই না। উপরে উপরে এমন ভাব দেখাও যেন আমাকে খুব কেয়ার করো আর ভিতরে ভিতরে অন্য কারো প্রতি আসক্ত হয়ে আছো।আমার চাইনা তোমার এমন কেয়ার। আমি এখন থেকে আমার মত করেই চলব আর তুমি তোমার মত। আমার প্রতি আর কোনরকম অধিকার ফলাতে দেব না তোমাকে।
বুঝেন ঠেলা যার জন্য করে চুরি সেই বলে চোর। যার জন্য আরিয়ানের ঠোঁট ফুললো,আঁড়চ খেলো সেই এখন আরিয়ানকে ভুল বুঝছে। এই হলো ভালোবাসার এক সমস্যা এ ওকে সন্দেহ করে তো ও ওকে সন্দেহ করে।যাইহোক ওরা যা মন চায় করুক আমরা গল্পে ফিরি।
আরিয়ান রাফাতের বাসায় গেল গিয়ে শুনল রাফাত বাসায় নেই। ওকে পুলিশ স্টেশনে ডেকেছে। আরিয়ান দ্রুত রাফাতের বাসা থেকে বেরিয়ে পুলিশ স্টেশনের দিকে চলে গেল।
সেই পোড়া গাড়ির ভিতর পুলিশ একজনের পোড়া লাশ পাওয়া পেল। পোড়া লাশ টার এমন অবস্থা হয়েছে যে লাশ টাকে কিছুতেই শনাক্ত করা যাচ্ছে না। পুলিশ লাশ টাকে মর্গে পাঠিয়ে দিল। সমস্ত ফর্মালিটিস শেষ করে যদি লাশের পরিবারের কোন সন্ধান পাওয়া যায় তাহলে লাশ তাদের কাছে হ্যান্ড ওভার করবে আর না হয় দাফন সম্পন্ন করে ফেলবে।
আরিয়ান পুলিশ স্টেশনে গিয়ে দেখল রাফাত কে পুলিশরা কোন একটা বিষয়ে জেরা করছে।
রাফাত আরিয়ানকে দেখা মাত্রই বলে উঠলো,
------ আরিয়ান তুই এসেছিস আমাকে বাঁচা ভাই আমি দারুণভাবে ফেঁসে গেছি।
------ কেন কি হয়েছে?
------- দেখ না এরা কি সব বলছে। এরা বলছে আমার গাড়ি তে নাকি কারো একটা পোড়া লাশ পাওয়া গেছে। আমি তো এই ব্যাপারে কিছুই জানিনা কি করে গাড়িটা ওখানে পৌঁছালো কে গাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিল আর কিভাবে পুড়ে মারা গেল।আমি তো গাড়িটা ঠিক করার জন্য গ্যারেজে দিয়েছিলাম। বিশ্বাস কর আমি কিছুই জানি না এই ব্যাপারে।
রাফাতের কথা শুনে তো আরিয়ান তো রীতিমতো ভোরকে গেল।
------ মানে? কি বলছিস কি তুই এইসব।
পুলিশ অফিসার সাব্বির রাফাত কে ধমকের স্বরে বলল,
------ তাহলে আপনার গাড়িটা কি ওখানে হেঁটে হেঁটে গেছে।
আরিয়ান পুরো বিষয়টা জানতে চাইলো সাব্বিরের কাছে।
সাব্বির বলল,
------ সকালের একজন লোক থানায় ফোন দিয়ে বলল একটা গাড়ি এক জায়গায় পুড়ে পড়ে আছে। হয়তোবা রাত্রে বেলা কেউ গাড়ি টাতে কেউ আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। পুলিশ যখন গাড়িটা চেক করল তখন তাতে একটা পোড়া লাশ পাওয়া গেছে। আর আমরা খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি সেই গাড়িটা মিস্টার রাফাতের সুতরাং সেই হিসেবে উনাকে আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করছি।
------ দেখুন অফিসার কেউ আমাকে চরমভাবে ফাঁসাচ্ছে আমি এই সম্পর্কে কিছুই জানিনা। আমার গাড়িটা সমস্যা দেখা দেওয়াতে আজকে প্রায় এক সপ্তাহ যাবত আমার গাড়িটা গ্যারেজে সার্ভিসিংয়ে দিয়েছিলাম তারপরে এর মধ্যে আর খবর নেয়ার সময় পাইনি। আপনার যদি বিশ্বাস না হয় তাহলে ওই গ্যারেজের লোকজনের কাছে আপনি জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন।
------ আপনি কি মনে করেন পুলিশ এতই বোকা পুলিশ কে এই সব শিখিয়ে দিতে হবে সে কখন কোন কাজ করবে। আশেপাশের সব গ্যারেজে খোঁজ নেয়া হয়েছে এমন কোন গাড়ি মিসিং হয়নি কোন গ্যারেজ থেকে।
আরিয়ান যেন দর্শকের মত সব খালি শুনছিল আর দেখছিল। আরিয়ান ভালো মতোই জানে সেই গ্যারেজ খুঁজে পেলেও তার কোন তথ্য পাওয়া যাবে না কারণ গ্যারেজের লোক মিসিং।
আরিয়ান সাব্বির কে বলল,
------- নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও ভুল হচ্ছে। কেউ রাফাত কে ফাঁসাতে চাইছে। তার না হলে রাফাত কেন এইরকম একটা ভুলভাল কাজ করবে। কোন না কোন বড় ধরনের চক্রান্ত হচ্ছে এর পিছনে। আপনারা আপনাদের মত ইনভেস্টিগেশন করুন তারপর বাকিটা যা করার আপনারাই করবেন।
সাব্বির রাফাত কে উদ্দেশ্য করে বলল,
------ সে টা তো অবশ্যই করবো। কিন্তু সেই পর্যন্ত মিস্টার রাফাত আপনি এলাকা ছেড়ে কোথাও যাবেন না।আর যখনই ডাকবো তখনই আপনাকে এখানে আসতে হবে। এবার আপনি আসতে পারেন।
ওরা ওখান থেকে চলে গেল। হাজার ও চিন্তা আরিয়ানের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।তবে আরিয়ান এটা বুঝতে পারছে এই সব কিছুই মাইশাকে ঘিরেই হচ্ছে। তুমি একজন খুব শক্তভাবে কল কাঠি নাড়ছে তাদের পেছনে।কিন্তু কেন?এর উত্তর টাই আরিয়ান কে খুঁজে বের করতে হবে।
মাইশা উদাস মনে ছাদে দাঁড়িয়ে আছে। বাসায় কেউ নেই। আলিয়া গেছে ওর এক বান্ধবীর বাসায়, ওর মামা আর মামী গেছে ডাক্তারের কাছে। আর আরিয়ান তো এখনো বাসাই ফেরে নি। একা একা ভাল লাগছিল না তাই মাইশা ছাদের এক কোনায় এসে দাঁড়িয়ে আছে। আরিয়ানের ঠোঁটের ফোলা আর গলায় আঁচড়ের দাগ খুব ভাবাচ্ছে মাইশাকে। মাইশার মনের মধ্যে যেন ঝড় চলছে। এ এমন এক ঝড় যা মাইশা ইচ্ছা করলেও থামাতে পারছে না। মুহূর্তেই মাইশার চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে এল। হঠাৎ মাইশার মনে হল ওর পিছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
মাইশা পিছনে ঘুরতে হঠাৎ.....
চলবে
প্রেম আমার (পর্ব ৯)
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
780
Views
21
Likes
3
Comments
4.7
Rating