মিশন সুন্দরবন (১)

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
ঘড়ির কাঁটা রাত ২টা ছুঁই ছুঁই। খুলনার রূপসা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে একদল মানুষ একে একে নামছে একটি ট্রলারে। চারদিক নিস্তব্ধ, কেবল মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক। চারপাশে অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে, আকাশে মেঘ জমেছে গভীরভাবে।

ট্রলারে উঠা মানুষেরা সেনাবাহিনীর মতো পোশাক পরা নয়, আবার সম্পূর্ণ অসামরিকও নয়। কারো কাঁধে ঝোলানো ক্যামেরা, কারো হাতে ড্রোন কন্ট্রোলার, কারো আবার পেছনে ঝুলছে বিশাল ব্যাগে ফিল্ড মেডিক সরঞ্জাম। এই একটা দলে আছে বন্যপ্রাণী গবেষক, ভিডিওগ্রাফার, বোটম্যান, একজন বনবিভাগের অফিসার এবং একজন সেনাবাহিনীর গোপন ইউনিটের সদস্য।

সবার নেতৃত্বে আছেন রেজওয়ান কর্নেল, বয়স প্রায় চল্লিশের কাছাকাছি, গাঢ় দাড়ি, কড়া চোখ, এবং কথায় কোনো বাড়াবাড়ি নেই। তাঁর ডানপাশে বসে থাকা তরুণীটি হচ্ছেন ড. তাসনিম ফেরদৌস, সুন্দরবন প্রাণীকুল নিয়ে পিএইচডি করছেন, যুক্ত ছিলেন বাঘের ওপর স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং প্রজেক্টে।

“সবাই ভালো করে শুনুন,” রেজওয়ানের কণ্ঠ ছিল সোজাসাপ্টা, “আমরা যাচ্ছি সুন্দরবনের খাঁড়ির ভিতর, যেখানে গত একমাসে তিনজন বনরক্ষী নিখোঁজ হয়েছেন। সর্বশেষ লোকেশন ছিল ধুমঘাট জোন, কিন্তু তারপরে রেডিও সিগন্যাল গায়েব। আমাদের মিশনের নাম—মিশন সুন্দরবন। উদ্দেশ্য: নিখোঁজদের সন্ধান, বন্যপ্রাণী তথ্য সংগ্রহ, এবং… যদি কিছু অপারেশনাল ঝুঁকি থাকে—তাহলে তা নিরসন।”

ড. তাসনিম ফিসফিস করে বললেন, “আপনি কি মনে করছেন, জলদস্যু কিংবা নতুন কোনো গ্রুপ সক্রিয় হয়েছে?”

রেজওয়ান সরাসরি উত্তর দিলেন না। শুধু বললেন, “সুন্দরবনের অন্ধকার সবসময় সরল নয়।”

ট্রলার চলে গেল রাতের নদীপথে। তলা দিয়ে কালো জল বয়ে যাচ্ছে, মাঝে মাঝে কচুরিপানার স্তূপ ঠেলে দিচ্ছে নৌকাকে। নদীর ঘূর্ণিপাকে ঘুড়ি পাখির ডাক ভেসে এলো দূর থেকে। সবার মুখে উত্তেজনার ছায়া, কিছুটা ভয়, আবার কিছুটা অজানা রোমাঞ্চ।


---

সকাল বেলা—প্রথম আলো যখন পাতা ভেদ করে গাছের ছায়ায় এসে পড়ল, ট্রলার তখন পৌঁছেছে ধুমঘাট খাঁড়ির কাছাকাছি। জায়গাটা একেবারে জনমানবহীন, বন এত ঘন যে দিনের বেলাতেও আলো কম পড়ে। চারপাশে কেবল বাদুড় আর পাখির ডাক, মাঝে মাঝে চিত্রা হরিণের পাল দেখা যায়।

বোটম্যান মো. হামিদ বললেন, “এই জায়গায় একবার গেলে কেউ আবার ফিরে আসে না। স্থানীয়রা জায়গাটার নাম দেয়—অন্ধকার জঙ্গল।”

সবার চোখে কৌতূহল।

তাসনিম তার নোটবুক খুলে বললেন, “এই এলাকায় একটা অদ্ভুত জিনিস খেয়াল করা গেছে। গত ছয় মাসে অন্তত চারটা রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ট্র্যাক হঠাৎ থেমে গেছে। ট্র্যাকিং কলার অফ হয়ে গেছে, কিন্তু লাশ পাওয়া যায়নি।”

ভিডিওগ্রাফার আরমান ক্যামেরা হাতে ঝুঁকে বলল, “মানে কি? কেউ ইচ্ছা করে অফ করে দিচ্ছে?”

রেজওয়ান গম্ভীর মুখে বললেন, “কিছুই বলা যাচ্ছে না। কিন্তু এখানে কিছু একটা অস্বাভাবিক ঘটছে। সরকার চায় বিষয়টা লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে যাক। যদি কোনো অপরাধ চক্র এই গভীর বনে আশ্রয় নেয়, তাহলে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিপদ হতে পারে।”

ট্রলার থেকে নেমে সবাই জুতার ফিতে শক্ত করে বাঁধল, অস্ত্র ও ক্যামেরা প্রস্তুত। তারা হাঁটতে শুরু করল গহীন জঙ্গলের দিকে।


---

প্রথম ঘন্টায় কিছুই ঘটল না। শুধু বনের শব্দ, বাদুড়, বানর, মাঝে মাঝে বাঘের পায়ের ছাপ।

তাসনিম নিচু গলায় বললেন, “দেখুন, এইটা একদম ফ্রেশ ট্র্যাক… এই মাত্র কেউ হেঁটেছে। দেখুন পায়ের দাগ... হ্যাঁ, বুটের চিহ্ন… মিলছে না আমাদের কারো জুতার সাইজের সাথে।”

রেজওয়ান সংকেত দিলেন। সবার হাতে রেডিও।

হঠাৎ করেই পেছন দিক থেকে গুলির শব্দ।

ঠাস! ঠাস!

আরমান চিৎকার দিয়ে উঠল, “তাসনিম! নিচু হও!”

তাসনিম পড়ে গেল মাটিতে, কিন্তু গুলি তাকে স্পর্শ করেনি। রেজওয়ান রাইফেল তুলে ফেলে দিয়ে গুলি চালাল সামনে।

“কভারে যাও! সবাই গাছের আড়ালে!”

তিন মিনিটের মধ্যেই গুলি থেমে গেল। সবাই নিরাপদ, কিন্তু চারপাশে কেউ নেই। কে গুলি করল, কোথা থেকে—ধরা গেল না।

“কেউ দেখেছ?” রেজওয়ান প্রশ্ন করলেন।

“না স্যার,” হামিদের গলা কাঁপছে, “এখানে কেউ নেই, কিন্তু… গন্ধ পাচ্ছেন? কেমন যেন পচা মাংসের গন্ধ!”

তারা এগিয়ে গিয়ে দেখে, গাছের গুঁড়ির নিচে পড়ে আছে একটা পুরনো ইউনিফর্ম… বনরক্ষীর। পাশে একটা ভাঙা ওয়াকি-টকি, আর একটা ছবি—তিনজন বনরক্ষীকে জঙ্গলের মাঝে দাঁড়িয়ে দেখা যাচ্ছে।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—ছবিতে চতুর্থ একজনও দাঁড়িয়ে, যার মুখ অন্ধকারে ঢাকা, কিন্তু চোখ… যেন এক জ্বলন্ত অমানবিক ছায়া।


---

সন্ধ্যা নামে ধীরে ধীরে। ক্যাম্প বানানো হয় একটা শুকনো জায়গায়, চতুর্দিকে কাঁটাতার বসানো হয় এবং গাছের উপরে থার্মাল ক্যামেরা সেট করা হয়।

রাত দশটার দিকে তাসনিম রেকর্ডিং দেখতে গিয়ে থমকে গেল।

“রেজওয়ান ভাই, এটা দেখুন... আমার ড্রোন ফুটেজে একজন মানুষ দেখা যাচ্ছে—সাদা ধুতি, লম্বা চুল, পেছন ঘুরে দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু সেই মুহূর্তে আমাদের রাডারে কারো উপস্থিতি ধরা পড়েনি।”

রেজওয়ান মনিটর তাকিয়ে চুপ করে থাকলেন। “এটা সাধারণ মানুষ না।”

“তাহলে?”

রেজওয়ান উত্তর দিলেন, “সুন্দরবনের গভীরে এক পুরনো কিংবদন্তি আছে, চোখাল রাজা নামে। লোকজন বলে সে বনের সীমানা রক্ষা করে, তার চোখে চোখ পড়লে মানুষ আর ফেরে না। কিন্তু এগুলো তো গুজব ছিল... অথচ এখন এসব কাকতালীয় নয়।”

তাসনিম ফিসফিস করে বলল, “আমার মনে হয় আমরা কোনো মানবচক্রে পড়েছি, যারা এই গুজবকে ঢাল বানিয়ে কাজ চালাচ্ছে।”

কিন্তু সেদিন রাত ৩টার সময় ক্যাম্পের থার্মাল সেন্সরে দেখা গেল এক অদ্ভুত দৃশ্য।

কেউ একজন ক্যাম্পের ৫০ মিটার দূরে দাঁড়িয়ে আছে। চেহারা অস্বচ্ছ, কিন্তু সিলুয়েট দেখা যাচ্ছে। ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। কারো পা চলছে না, যেন মাটি থেকে ভেসে আসছে। সেন্সর তাপমাত্রা দেখাচ্ছে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস—যেটা কোনো জীবিত প্রাণীর পক্ষে সম্ভব নয়।

সবার দম বন্ধ হয়ে এলো।

ঠিক সেই সময় ক্যাম্পের বাইরে একটা বিকট শব্দ।

ঘ্যাঁচচচচ!
কাঁটাতার ছিঁড়ে যাচ্ছে!

রেজওয়ান রাইফেল তুলে বললেন, “সবাই প্রস্তুত! আলো জ্বালাও!”

আলো জ্বলে উঠতেই দেখা গেল—ক্যাম্পের পাশে একা দাঁড়িয়ে আছে একটা ছোট বাঘশাবক। চোখে পানি, গায়ে রক্ত।

তাসনিম দৌড়ে গিয়ে ধরল তাকে। কিন্তু তার পেছনে—গভীর জঙ্গলের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল সেই ছায়ামূর্তি। চোখ দুটো লালচে আগুনের মতো জ্বলছে।

এক মুহূর্তে জঙ্গল কাঁপিয়ে উঠল এক বিকট গর্জন।

গৃরররররররররররর!!





To Be Continued..........………
48 Views
4 Likes
0 Comments
4.0 Rating
Rate this: