রাত তখন ৩ টা

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
চট্টগ্রামের অদূরের পাহাড়ি অঞ্চল ‘সাতছড়ি’-র একটা পুরনো সরকারি হাসপাতাল—নাম "আলোর পথ ক্লিনিক"। কিন্তু আলো এই হাসপাতালে বহু বছর নেই।
সরকারের খাতায় এটি এখনও "অস্থায়ী বন্ধ", অথচ ভেতরে অল্প কয়েকজন ডাক্তার আর দুইজন প্রহরী মিলে রাত-দিন রোগী দেখেন, কেউ কেউ এখানেই আছেন মাসের পর মাস।

রাত তখন ০৩টা।
সেই গভীর নিশি যখন মশার ডাক ছাড়া কিছু শোনা যায় না, আর বারান্দায় বৃষ্টির পানির টুপটাপ শব্দ একরকম মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে, তখন ক্লিনিকের নিচতলায় দারোয়ান মিজান ঘুমাচ্ছিল না।

তার চোখে ঘুম ছিল না গত কয়েক রাত ধরে।
সে বুঝে গিয়েছিল—এই ক্লিনিকটা কেবল রোগীদের নয়, আরও কিছু ‘অচিন বস্তু’রও আশ্রয়।

“স্যার, আমি একটু উপরে যাচ্ছি,” সে ইন্টারকমে বলে উঠল সাইফুল ডাক্তারকে, যিনি তখন একা ছিলেন ডাক্তারদের ঘরে।

সাইফুল বিরক্ত গলায় বললেন, “এই রাতে আবার কী হইছে মিজান? ভূতের খোঁজে যাচ্ছ?”

মিজান ঠোঁট কামড়ে বলল, “আপনি হেসেন না স্যার... চার নাম্বার ওয়ার্ড থেকে কেউ বারবার বেল বাজায়। অথচ ঐ রুমটা তো খালি!”


---

চার নাম্বার ওয়ার্ড।

এই ঘরটা একসময় ছিল প্যাথলজি রুম। একবার একজন মানসিক রোগীকে বেঁধে রাখা হয়েছিল এখানে। লোকটা রাতে নিজের চোখ তুলে ফেলেছিল।
তারপর থেকে এই ঘর তালা দেয়া থাকে। কেউই সাহস করে না ঢুকতে। অথচ প্রতিদিন রাত ৩টা বাজতেই কেউ একটা বোতাম চাপায়—ওয়ার্ড বেল বেজে ওঠে।

মিজান ধীরে ধীরে উঠে গেল। সঙ্গে নিল তার শক্ত টর্চলাইট।

চতুর্থ নাম্বার ওয়ার্ডের সামনে এসে সে থমকে দাঁড়াল। দরজার নিচ থেকে আলো বের হচ্ছে।

“কে আছে ভিতরে?” মিজান বলল। কোনো উত্তর নেই।

সে দরজাটা ঠেলে খুলতেই দেখতে পেল—ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একজন মেয়ে। সাদা থ্রি-পিস পরে, মাথা নিচু। চুল ঝুলে পড়েছে। মুখ দেখা যাচ্ছে না।

“আপনি কে? কী করছেন এখানে?” মিজানের কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল।

মেয়েটি ধীরে ধীরে মুখ তুলল... এবং...

ওর চোখ... নেই।

দুইটা কালো ফাঁকা গহ্বর, যেখান থেকে টুপটাপ করে রক্ত ঝরছে।


---

মিজান পেছনে ঘুরে পালাতে গেল, কিন্তু তখন দরজা বন্ধ। ভেতর থেকে।

ঘরের চারপাশে এখন যেন কেউ ফিসফিস করছে। ছাদের পাখা বন্ধ, তবুও বাতাস ঘুরছে। দেওয়ালে আগের কোনো রোগীর নাম লেখা ছিল—সেগুলো মুছে গেছে, আর সেখানে এখন অদ্ভুত সব নখের আঁচড়।

মেয়েটি এবার এগিয়ে এলো, গলার আওয়াজ যেন গুটিয়ে উঠল, “আমার চোখ তুমি নিয়েছিলে... ফিরিয়ে দাও...”


---

মিজান আর চিৎকার করতে পারল না। মুখ খুলে গলা চেপে ধরল কেউ। এক অদৃশ্য শক্তি যেন ওর শরীরে ঢুকে পড়ল। সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল।


---

পরদিন ভোর।

সাইফুল ডাক্তার এসে দেখে—চার নাম্বার ওয়ার্ডের দরজা খোলা। ভেতরে মিজান অজ্ঞান। আর দেয়ালে বড় করে লেখা—

"ওই সময়ে কেউ থাকলে চলে যায় না। কারণ রাত ৩টা কারও না।"


---

তারপর থেকে আর কেউ সাহস করে না রাতে একা নিচতলায় যায়। ৩টা বাজলে সব আলো নিভিয়ে রাখা হয়।

তবুও, কোনো কোনো রাতে হাসপাতালের করিডোরে শোনা যায় সেই বেল টিপে যাওয়ার শব্দ।
টিং... টিং... টিং...

কেউ বলে, সে এখনও খুঁজে ফিরছে... তার হারিয়ে যাওয়া চোখ...


সমাপ্ত.........................
44 Views
4 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: