পরিবার

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
ঢাকার শ্যামলী এলাকায় একটি তিনতলা বাড়ি। ছিমছাম, মাঝারি সাইজের, একদম উপরের তলায় থাকে রওশন আরা বেগম – সংসারের অভিভাবক। ছেলেমেয়েরা সবাই বড় হয়েছে, যার যার জীবন নিয়ে ব্যস্ত। তবে মা যেন সময়ের বাইরে থাকেন—ঘড়ি, দিন, মাস তাঁর জন্য তেমন কিছু নয়। একটাই চিন্তা: “এই পরিবারটা ধরে রাখব কেমন করে...”

রওশন আরা বেগমের চার সন্তান—দুই মেয়ে, দুই ছেলে। বড় মেয়ে জিনাতের বিয়ে হয়েছে উত্তরায়। চাকরিজীবী স্বামী, দুই সন্তান, ব্যস্ত জীবন। বড় ছেলে সাবের ব্যাংকে চাকরি করে, বনানীতে ফ্ল্যাট নিয়ে আলাদা থাকে। মেঝো ছেলে রিয়াজ মালয়েশিয়ায়—তিন বছর ধরে একবারও দেশে আসেনি। আর ছোট মেয়ে আঁখি, সে-ই একমাত্র এখনো মায়ের সঙ্গে থাকে।

আঁখি ইংরেজিতে অনার্স করছে, কিন্তু মন পড়াশোনায় একেবারেই নেই। সারাদিন ফোন, ফেসবুক, আর ইউটিউব। আর মাঝেমধ্যে বন্ধুদের সঙ্গে ক্যাফে, শপিং, অথবা গুলশানের কোথাও গিয়ে ছবি তোলা। মা মাঝে মাঝে বলে, “তুইও একদিন যাবি, জানি... তখন এই ঘর খালি হয়ে যাবে।”

আঁখি রাগ করে বলে, “মা, একটু আধুনিক হও! আমি কি কোথাও যাচ্ছি এখন?”

রওশন আরা বেগম চুপ করে থাকেন। তিনি জানেন, সময় যত যায়, তত এই সংসার ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাচ্ছে। সবাই ভালো আছে, কিন্তু একসাথে নেই। এটা তাঁর কাছে ভালো থাকা নয়।

এক শুক্রবার সকালে রওশন আরা বেগম বসলেন পুরনো অ্যালবামের সামনে। সাদা-কালো ছবি, বিয়ের অনুষ্ঠান, গ্রামের বাড়ির উঠোনে তোলা দলবদ্ধ ছবি, ছোট্ট সাবেরের মাথায় তেল দিয়ে খেজুর গাছের নিচে বসে থাকা… চোখে পানি এসে যায়।

একটা ছবি হাতে নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন—সবাই একসাথে ঈদের দিনে তোলা। আঁখি তখন সবে পাঁচ বছর বয়সী। পাশে জিনাত, হাতে সেমাইয়ের হাঁড়ি। রিয়াজ বাবার কাঁধে বসে হাসছে, সাবের নতুন পাঞ্জাবি পরে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে। বাবা, যিনি গত সাত বছর হলো আর নেই, মাঝখানে দাঁড়িয়ে সবার উপর ছায়া হয়ে ছিলেন।

তাঁর তখন মনে হলো—এই 'পরিবার' নামের জিনিসটা কি শুধু ছবি আর স্মৃতিতে আটকে যাবে?



রওশন আরা বেগম একদিন আঁখিকে ডাকলেন।
— “একটা কথা বলব?”
— “আবার কী মা?”
— “তোর ভাইবোনদের সবাইকে একবার ডেকে আনতে পারিস না?”
— “মানে?”
— “ঈদের আগের শুক্রবারটা সবাই মিলে এখানে কাটাক। একটা দিন একসাথে। আমাদের বাড়িতে। আমি রান্না করব, তুই একটু সাহায্য করবি, আর সবাই আসবে।”

আঁখি ভ্রু কুঁচকে বলল, “সাবের ভাইয়া তো খুব ব্যস্ত, আপু তো প্ল্যান করে ফেলেছে কক্সবাজারে যাবে, আর রিয়াজ ভাইয়া তো...”

— “তুই শুধু বল। আমার জন্য বল।”

মায়ের কণ্ঠে এমন কিছু ছিল, যা আঁখিকে নরম করে দিল। সে ঠিক করল, চেষ্টাটা করবে।



প্রথম ফোন করল জিনাতকে।

— “আপু, মা চায় সবাই একসাথে একদিন থাকুক। আসবে?”

— “আঁখি, ঈদের ঠিক আগের শুক্রবার? তুই জানিস আমি তো ট্যুরে যাব!”

— “তোর ছেলে মায়ের বাড়ি যাবে না একদিন? একদিনের জন্য ডেট পাল্টাতে পারিস না?”

জিনাত কিছুক্ষণ চুপ। তারপর বলল, “দেখি... সাবেরকে বলিস?”



সাবেরকে ফোন করলে সে ব্যস্ত কণ্ঠে বলল, “ওফ! আমার অফিসের ক্লোজিং, ছুটি নিতে পারব না।”

— “মা কিছু বলেনি তোকে?”

— “আম্মা আমাকে কখনো কিছু বলেন না, তোরা সবাই কাছে থাকিস...”

আঁখি ধমক দিল, “তোদেরই কাছে থাকতে চায়, কিন্তু তোরা তো আসিস না!”

সাবের একটু চুপ করে বলল, “আচ্ছা, দেখি, চেষ্টা করব। একদিন তো বোনের আবদার রাখতে পারি!”



সবচেয়ে কঠিন ছিল রিয়াজ। তার সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে কথা হয়, কিন্তু সে খুব একটা আবেগ দেখায় না। আঁখি সাহস করে ভিডিও কল করল।

— “ভাইয়া, মা কিছুদিন ধরে খুব মন খারাপ করে থাকে...”

— “হুঁ। আমি তো বুঝি।”

— “ঈদের আগের শুক্রবারে সবাই একত্রিত হবে... যদি তুমিও আসতে পারো...”

রিয়াজ একটু হাসল। “এত সহজ নয়, আঁখি। কোম্পানি ছুটি দেবে না।”

— “একটা দিন! শুধু একটা দিন, ভাইয়া! প্লেনের টিকিট আমি কেটে দিচ্ছি।”

রিয়াজ এক মুহূর্তের জন্য স্থির থাকল। তারপর বলল, “তুই টিকিট দিচিস, এইটার মানে বুঝি আমি। ঠিক আছে। আসছি।”



ঈদের আগের শুক্রবার সকালে রওশন আরা বেগমের রান্নাঘরে হাঁড়ি-পাতিলের গন্ধে ভরে গেল। তিনি হাঁসের মাংস রান্না করছেন, পোলাও হচ্ছে, শুটকি দিয়ে বেগুন ভাজা, আবার ছেলের পছন্দের খিচুড়ি ও গরুর মাংস। আঁখি পাশে দাঁড়িয়ে রুটি বানাচ্ছে।

দুপুরে একে একে সবাই আসতে লাগল। প্রথমে সাবের, স্ত্রী আর ছেলেমেয়ে নিয়ে। এরপর জিনাত, গিফ্ট হাতে করে। শেষে সন্ধ্যার দিকে দরজায় বেল—রিয়াজ।

রওশন আরা দরজা খুলে স্তব্ধ। ছেলে মুখে মাস্ক, হাতে ব্যাগ, চোখে ক্লান্তি—তবু ভেতরে হাসি।

— “মা, আমি এসেছি।”

রওশন আরা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। তারপর নিজের বুকের দিকে ছেলেকে টেনে নিলেন।



সেই রাতে সবাই মিলে বসার ঘরে বসে গল্প করল, পুরনো ছবি দেখল, বাবা সম্পর্কে কথা বলল, আর খুশিতে আঁখির মুখ ঝলমল করল।

রওশন আরা বেগম সবাইকে দেখে একপাশে বসে চোখ মুছলেন। তারপর মৃদু স্বরে বললেন—

— “পরিবার মানে শুধু রক্তের সম্পর্ক না। পরিবার মানে একসাথে থাকা, সময় দেয়া। তোরা সবাই আসলি বলে আমি আজ আবার নিজের মায়ের মত বাঁচতে পারলাম।”

ঘরে তখন নিস্তব্ধতা। তারপর ধীরে ধীরে সবাই একে অপরের হাত ধরল। যেন এই ছোট্ট বাড়িতে আবারও জন্ম নিল একটুকরো ‘পরিবার’।
94 Views
8 Likes
1 Comments
0.0 Rating
Rate this: