সন্ধ্যেটা যেন আগুনে ঝলসে যাচ্ছে। চারপাশে কুয়াশার মত ধোঁয়া, গলির ভেতর ভেজা নর্দমার গন্ধ, আর তার মাঝখানে বসে আছে লোকটা—নীরব, নিঃস্ব, নাম তার আদিল।
কেউ আজ আর তাকে ডাকে না। একদিন যাকে পুরো পাড়া “ভাই” বলে চিনত, সে আজ সবার চোখে শুধু একটা অভিশাপ। কারণ পাঁচ বছর আগে, এই মানুষটাই তার স্ত্রী রিনার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। সবাই বলত, "রিনা তাকে ঠকিয়েছিল, পরকীয়ার সন্দেহ ছিল..." কিন্তু আসলে কি ঘটেছিল, কেউ জানত না।
রিনা মারা যায়নি। পুড়ে যাওয়া মুখ নিয়ে, একঘরে হয়ে, সে বেঁচে আছে ঢাকার এক আশ্রয়কেন্দ্রে। আর আদিল, জেল খেটে বের হয়ে নিজেরই বানানো নরকে বাস করছে।
রোজ রাতে সে কাঁদে। নিজের ঘরে না, মাজারে গিয়ে। ভাঙা গলার ফিসফিসানিতে সে বলে, “আমি তাকে মেরে ফেলিনি, আমি নিজেকে শেষ করেছি। আমি বাঁচি না আর… আমি প্রতিদিন মরছি।”
কিন্তু কেউ কান দেয় না। নরক তো শুধু মৃত্যুর পরের নয়—এই শহরে, এই জীবনে, এই চেতনার ভেতরেও নরক আছে।
একদিন খুব ভোরে হঠাৎ করে দরজায় কড়া নাড়ে কেউ।
আদিল দরজা খুলে দেখে... রিনা।
মুখের অর্ধেকটা জ্বলে গেছে, কিন্তু চোখ দুটো একদম আগের মতোই শক্ত, ঝকঝকে।
আদিল স্তব্ধ। এক মুহূর্তে হাজারটা অনুশোচনা, কান্না, গ্লানি জমে ওঠে মুখে।
সে বলে, “তুই কেন এসেছিস?”
রিনা শুধু বলে, “তুই জেলে ছিলি, আমি মুক্ত। কিন্তু এখন দেখছি তুই জেলের বাইরে থেকেও জেলের ভেতরে... নরকের ভেতরে আটকে আছিস।”
আদিল চোখ মুছে বসে পড়ে, মাথা নিচু করে।
“আমি জানি, আমি ক্ষমার যোগ্য না,” সে বলে, “তবু যদি একবার বলিস, আমি মানুষ ছিলাম কোনোদিন...”
রিনা চুপ করে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে বলে, “তুই মানুষ ছিলিস, এখনো আছিস… কারণ নরকে থেকে যারা অনুশোচনা করতে পারে, তারা এখনো পুরো পুড়ে যায়নি।”
আদিল ফুপিয়ে ওঠে।
রিনা একবারও ওর গায়ে হাত দেয় না। শুধু বলে, “তুই মরিস না। তোকে বাঁচতে হবে। আমার মুখটা যেভাবে পোড়েছে, তোর মনটাও পোড়াতে হবে… যতদিন না তুই নিজেকে বদলে ফেলিস।”
সেদিনের পর আদিল আর আগের মত থাকেনি। সে আশ্রয়কেন্দ্রে কাজ নেয়, পোড়া মুখের নারীদের পাশে দাঁড়ায়, রান্না করে, কাপড় ধোয়, খাট টানে।
সবাই বলে—ও তো সেই “ভয়ংকর মানুষ”।
কিন্তু এক বৃদ্ধা বলেন, “ভয়ংকর? না... আমি ওর চোখে দেখেছি নরক থেকে ফেরা মানুষদের আলো।”
নরক
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
80
Views
6
Likes
2
Comments
0.0
Rating