ঢাকার গুলশানে সদ্য নির্মিত হয়েছে একটি অভিজাত অ্যাপার্টমেন্ট, নাম স্কাইলাইন রেসিডেন্সি। বিশতলা এই ভবনটির তিনটি লিফট—লিফট ৫, ৬ এবং ৭। লিফট ৫ ও ৬ নিয়মিত চলাচলে থাকলেও, লিফট ৭ বরাবরই বন্ধ, তালাবদ্ধ। নতুন বাসিন্দারা যখন জানতে চান, তখন গার্ডরা শুধু বলেন, “সার্ভিসিংয়ে আছে।”
রেহান আহমেদ, একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার, স্ত্রী ও একমাত্র মেয়ে মাইশাকে নিয়ে সম্প্রতি উঠেছেন ১৭ তলায়। উঠেই দেখলেন, পুরো বিল্ডিং একদম নিখুঁত। নিরাপত্তা, সাজসজ্জা—সবই ঠিকঠাক। শুধু একটা জিনিস তাকে কিঞ্চিৎ অস্বস্তিতে ফেলল—লিফট ৭।
প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে রাত হয়। একদিন তিনি এসে দেখলেন, লিফট ৫ এবং ৬ মেরামতের জন্য বন্ধ। গার্ড বলল, “স্যার, আজকে শুধু লিফট ৭ চালু আছে। কিছুক্ষণ আগে খোলা হয়েছে।”
রেহান একটু দ্বিধায় পড়লেন। এতদিন যেটা বন্ধ ছিল, হঠাৎ চালু হলো কেন? তবে গার্ডের চোখেমুখে ভয় না দেখে তিনি ঢুকে পড়লেন সেই লিফটে।
লিফটের দরজা খুলতেই ভেতরে হালকা ধোঁয়াটে অন্ধকার। বাতিগুলো টিমটিম করে জ্বলছে। একটা ঝাঁঝালো গন্ধ ভেসে আসছে, ঠিক যেন পুরোনো, ভেজা ধাতুর গন্ধ। রেহান ১৭ তলার বাটন চাপলেন। দরজা বন্ধ হলো ধীরে ধীরে।
লিফট উঠতে থাকল, কিন্তু ১৪ তলায় এসে আচমকা থেমে গেল। দরজা খুলে গেল নিজে থেকেই। করিডোর অন্ধকার। কোথাও কেউ নেই। কেউ উঠল না, নামলও না। লিফট দরজা কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার বন্ধ হয়ে গেল। রেহান একটু অস্বস্তি অনুভব করলেন। পেছনে তাকিয়ে দেখলেন লিফটের কোণায় একটি সাদা কাপড় পড়ে আছে, যেন শিশুদের জামা। তিনি কিছু বলার আগেই লিফট আবার চলতে শুরু করল।
রাতে বাড়িতে ফিরে স্ত্রী নিশাতকে বিষয়টা বলতে গেলেন, কিন্তু কিছু বলার আগেই মেয়ে মাইশা এসে জড়িয়ে ধরল।
— “বাবা, আজ আমি একটা মেয়ের সঙ্গে খেলেছি!”
— “কোথায়?” রেহান জিজ্ঞাসা করল।
— “লিফটের কাছে। ওর নাম রুহি। ও বললো ওরা ১৩ তলায় থাকে।”
রেহান আঁতকে উঠলেন। ১৩ তলায় এখন কেউ থাকে না। ঐ ফ্লোর এখনো বিক্রি হয়নি বলে ফাঁকা রাখা হয়েছে। নিশাত বলল, “বাচ্চারা তো কল্পনাও করে, কিছু মনে করো না।”
পরের দিন রাতে রেহান আবার দেরিতে ফিরলেন। এবারও একই ঘটনা। আবার লিফট ৭ চালু, আবার উঠতে হলো। কিন্তু এবার ১৭ তলায় পৌঁছে লিফটের দরজা খুলতেই তিনি চোখের সামনে দেখতে পেলেন, করিডোরের এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে একটা ছোট মেয়ে, সাদা জামা পরে, পেছনে মুখ।
রেহান চিৎকার করতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু মেয়েটি এক মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে গেল। বাড়ি ফিরে স্ত্রীকে কিছুই বলেননি, কিন্তু মাথায় যেন হালকা ধোঁয়া।
তৃতীয় রাত, রাত ৩টার দিকে, হঠাৎ নিশাতের ঘুম ভেঙে গেল। মাইশার বিছানা খালি। আতঙ্কে ঘর থেকে বের হয়ে এসে দেখে—মাইশা দাঁড়িয়ে আছে ফ্ল্যাটের দরজার সামনে, একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বাইরে। দরজার নিচ দিয়ে কারও ছায়া যেন থেমে আছে। মাইশা বলল, “রুহি এসেছে আমাকে নিতে। ওর মা এসেছে সঙ্গে।”
ভয়ার্ত নিশাত তৎক্ষণাৎ মেয়েকে টেনে ধরে দরজা বন্ধ করে দেয়। ভেতর থেকে কোরআনের আয়াত চালু করে। কিছুক্ষণ পর দরজার নিচের ছায়াটা সরে যায়। মাইশা তখন চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বলে, “ওরা চলে গেছে... তবে আবার আসবে...”
রেহান পরদিন ম্যানেজমেন্ট অফিসে গিয়ে জানতে চাইলেন লিফট ৭ সম্পর্কে। একজন সিনিয়র কর্মকর্তা মুখ শক্ত করে বললেন, “আপনারা নতুন। আমরা চাইনি এসব জানাতে। প্রায় তিন বছর আগে এক দম্পতি ও তাদের মেয়ে ১৩ তলায় উঠতে গিয়ে লিফট ৭-এ ওঠেন। কিন্তু লিফট থামে ৭ তলায়। তারপর থেকে তারা নিখোঁজ। লিফটটি খোলা অবস্থায় পাওয়া যায়, কিন্তু ভেতরে কেউ ছিল না। এরপর থেকেই লিফট ৭ তালাবদ্ধ। কিন্তু গত রাতে কেউ যেন লিফটটি চালু করেছে।”
রেহান বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তিনি সিকিউরিটির সিসিটিভি রুমে গেলেন। অনুরোধ করে রাতে লিফট ৭-এর ক্যামেরা ফুটেজ দেখালেন। রাত ৩:১২ মিনিট। দরজা খুলছে, ধোঁয়ার মতো কিছু বের হচ্ছে। তারপর দেখা গেল—একজন নারী, মুখ চুলে ঢাকা, কোলে একটি শিশু। ধীরে ধীরে তারা লিফট থেকে বের হচ্ছে।
পাশ থেকে এক প্রহরী ফিসফিস করে বলে, “স্যার, এই মেয়েটার মুখ আপনার মেয়ের মতো না?”
রেহান চমকে উঠলেন। ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে থাকা মেয়েটির মুখ... হুবহু মাইশা!
রাতের পর রাত, প্রতিদিনই সেই লিফট ৭ খোলে, আরেকটি নতুন দরজা খোলে আরেকটি অজানা জগতে। এরপর রেহান পরিবার নিয়ে সেই ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে যায়। কিন্তু আজও মাঝে মাঝে কেউ কেউ বলে, গুলশানের সেই স্কাইলাইন রেসিডেন্সির লিফট ৭-এর দরজা মাঝরাতে খুলে যায় নিজে থেকেই।
ভেতর থেকে নাকি ভেসে আসে এক শিশুর কণ্ঠ—
“আমরা এখনো আছি… তুমি আমাদের সঙ্গে যাবে?”

সকল মন্তব্যগুলো (1)
ভালো।