ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসতেই নাদিয়ার ঘুম ভেঙে গেল। আলতো করে পাশে শায়িত ইমনের দিকে তাকালেন। শান্ত, স্নিগ্ধ মুখ। তার কপালে হালকা করে চুমু এঁকে বিছানা ছাড়লেন নাদিয়া। অজু করে জায়নামাজে দাঁড়ালেন। চারপাশের নীরবতা ভেদ করে তার কন্ঠে কোরআন তেলাওয়াতের সুর প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
নামাজ শেষে নাদিয়া কিছুক্ষণ মোনাজাত করলেন। তাদের ছোট্ট সংসার, স্বামী-সন্তানদের মঙ্গল কামনা করলেন। ইমনের ব্যবসায় যেন বরকত আসে, তাদের সন্তানরা যেন দ্বীনের পথে চলে—এই ছিল তার প্রতিদিনের প্রার্থনা।
সূর্য সবেমাত্র উঁকি দিচ্ছে। নাদিয়া রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালেন। ইমনের ঘুম ভাঙার আগেই তার জন্য গরম চা আর হালকা নাস্তার ব্যবস্থা করতে হবে। রান্নাঘরের মিষ্টি সৌরভে ভরে উঠল চারপাশ। রুটি ভাজা আর ডিমের সুগন্ধ নাদিয়ার মনে এক অনাবিল শান্তি এনে দিল।
কিছুক্ষণ পর ইমনও জেগে উঠলেন। চোখেমুখে তখনও ঘুমের আবেশ লেগে ছিল। নাদিয়ার হাতের ছোঁয়ায় তিনি সতেজ হলেন। টেবিলে সাজানো নাস্তা দেখে তার মুখে হাসি ফুটল।
"আলহামদুলিল্লাহ," ইমন বললেন, "তোমার হাতের তৈরি খাবার আমার দিনের সেরা শুরু।"
নাদিয়া মৃদু হাসলেন। "আল্লাহর রহমত আর আপনার ভালোবাসা আমার সব কাজের প্রেরণা।"
তাদের দুজনের মধ্যেকার এই ছোট্ট কথোপকথনই ছিল তাদের প্রতিদিনের জীবনের প্রতিচ্ছবি—ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতায় পরিপূর্ণ।
নাস্তা শেষ করে ইমন অফিসের জন্য প্রস্তুত হলেন। নাদিয়া তার পোশাক গুছিয়ে দিলেন, টাই ঠিক করে দিলেন। দরজার কাছে এসে ইমন নাদিয়ার কপালে আলতো করে চুমু খেলেন।
"সাবধানে থেকো," নাদিয়া বললেন।
"তুমি আর বাচ্চারাও খেয়াল রেখো," ইমনের কন্ঠে উদ্বেগ মেশানো স্নেহ।
ইমন বেরিয়ে গেলে নাদিয়া সন্তানদের ঘুম থেকে তুললেন। তাদের মুখের ঘুম জড়ানো মিষ্টি হাসি দেখে মায়ের মন ভরে গেল। নাশতা খাইয়ে তাদের মাদ্রাসায় পাঠানোর প্রস্তুতি নিলেন নাদিয়া।
তাদের বড় ছেলে আদিব, শান্ত ও পড়ুয়া। ছোট মেয়ে আয়েশা, দুরন্ত আর হাসিখুশি। নাদিয়া তাদের ইসলামিক আদব-কায়দা শেখাতেন, নবীদের গল্প বলতেন। তাদের মনে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা আর রাসূলের প্রতি ভক্তি জাগিয়ে তোলাই ছিল তার প্রধান লক্ষ্য।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। আদিব ও আয়েশা মাদ্রাসা থেকে ফিরে এলো। নাদিয়া তাদের দুপুরের খাবার দিলেন। এরপর তারা একসাথে কোরআন তেলাওয়াত করল। নাদিয়া তাদের তেলাওয়াত শুদ্ধ করে দিতেন, আয়াতের অর্থ বুঝিয়ে দিতেন।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। ইমন অফিস থেকে ফিরেছেন। তার মুখ দেখে মনে হচ্ছে আজকের দিনটা খুব একটা ভালো যায়নি। নাদিয়া এগিয়ে এসে তার হাত ধরলেন।
"ক্লান্ত লাগছে?" নাদিয়ার কন্ঠে Concern.
ইমন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "আজ ব্যবসায় একটু সমস্যা হয়েছে।"
নাদিয়া তাকে বসালেন, পানি দিলেন। "যা হয়েছে, আল্লাহর ফয়সালা। ভেঙে পোড়ো না। আল্লাহ নিশ্চয়ই ভালো কিছু করবেন।"
ইমনের হাত ধরলেন নাদিয়া। তার শান্ত ও আত্মবিশ্বাসী কন্ঠ ইমনকে সাহস যোগাল। তাদের সম্পর্কের এটাই বিশেষত্ব—সুখে-দুঃখে তারা সবসময় একে অপরের পাশে থাকে।
মাগরিবের আজান হলো। ইমন ও আদিব মসজিদে গেলেন নামাজ পড়তে। নাদিয়া ও আয়েশা ঘরেই নামাজ আদায় করলেন।
নামাজ শেষে তারা সকলে একসাথে রাতের খাবার খেলেন। খাবারের সময় নানা ধরনের আলোচনা হলো। আদিব মাদ্রাসার গল্প বলল, আয়েশা তার দিনের দুষ্টুমিগুলোর বর্ণনা দিল। ইমনের অফিসের কিছু কথাও উঠে এলো আলোচনায়। নাদিয়া মনোযোগ দিয়ে সকলের কথা শুনলেন, তাদের উৎসাহ দিলেন।
খাবার শেষে নাদিয়া ঘর গোছাতে লাগলেন। ইমন আদিবকে নিয়ে পড়াশোনায় বসলেন। আয়েশা তার মায়ের আশেপাশে ঘুরঘুর করছিল।
কিছুক্ষণ পর এশার আজান হলো। সকলে মিলে জামাতে নামাজ আদায় করলেন। নামাজ শেষে ইমন কোরআন তেলাওয়াত করলেন, নাদিয়া মনোযোগ দিয়ে শুনলেন।
তাদের দিন এভাবেই কাটে—আল্লাহর ইবাদত, একে অপরের প্রতি ভালোবাসা আর পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ। তাদের জীবন হয়তো খুব জাঁকজমকপূর্ণ নয়, কিন্তু শান্তি ও সন্তুষ্টিতে পরিপূর্ণ।
রাতে যখন সকলে ঘুমিয়ে পড়েছে, নাদিয়া জেগে রইলেন। জানালার বাইরে চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে পৃথিবী। তিনি আল্লাহর কাছে শোকরিয়া জানালেন—তাদের সুন্দর জীবনের জন্য, তাদের ভালোবাসার জন্য। তার মনে কোনো চাওয়া নেই, শুধু এই শান্ত ও পবিত্র জীবন যেন চিরস্থায়ী হয়—এই প্রার্থনাই তার অন্তরে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
হঠাৎ ইমনের হাতের স্পর্শে তার ধ্যান ভাঙল। ইমন জেগে উঠেছেন, তার দিকে গভীর মমতায় তাকিয়ে আছেন।
"ঘুমোও," ইমন বললেন, "অনেক রাত হয়েছে।"
নাদিয়া ইমনের বুকে মাথা রাখলেন। তাদের নীরব আলিঙ্গনে মিশে ছিল গভীর ভালোবাসা আর বিশ্বাস। তারা জানে, আল্লাহর রহমত তাদের সাথে আছে, তাদের পথ দেখাচ্ছে। এই বিশ্বাসই তাদের দাম্পত্য জীবনকে আরও সুন্দর ও মধুময় করে তুলেছে। সোনালী সকালের প্রতীক্ষায় তারা আবার ঘুমের দেশে তলিয়ে গেল।
চলবে..
সোনালী সংসার।
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
185
Views
0
Likes
0
Comments
5.0
Rating