তেকাঠি গাছের নিচে
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
পশ্চিমবঙ্গের এক প্রাচীন গ্রাম ভাণ্ডারডাঙা। লোকসংখ্যা খুবই কম। চারপাশে ধানক্ষেত, বাঁশবন আর একটা বড় পুকুর। সেই পুকুরের পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটা বিশাল শিরীষ গাছ। গ্রামের মানুষ একে বলে “তেকাঠি গাছ”—কারণ তার গোড়ায় তিনটা মোটা গুঁড়ি বেরিয়ে আছে মাটির উপর। স্থানীয়দের মধ্যে গুঞ্জন, এই গাছের নিচে রাত কাটালে আর ফেরা হয় না।
কেউ বলেন, ওখানে প্রেতআত্মা আছে। কেউ বলেন, ওই গাছ নাকি "শয়তানের দরজা।" কিন্তু সেসব গল্প যে কতটা সত্যি, কেউ জানে না।
কলকাতা থেকে তিন বন্ধু—অনিরুদ্ধ, সৌরভ আর দীপা—গরমের ছুটিতে বেড়াতে আসে অনিরুদ্ধের মামাবাড়ি, এই ভাণ্ডারডাঙায়। দীপা আর সৌরভ ইউটিউবে হরর কনটেন্ট বানায়, তাই তারা খুবই উৎসাহী গ্রামের এই ভয়াল লোককথা শুনে।
মামা কড়া গলায় সাবধান করে বলে, “তেকাঠি গাছের দিকে যেও না, রাতে তো নয়ই। ওই গাছ খায়।”
তবে সতর্কবার্তা সত্ত্বেও এক রাতে তিন বন্ধু ঠিক করে যায় গাছটার কাছে। দীপা সঙ্গে এনেছে তার DSLR ক্যামেরা, অনিরুদ্ধ মশার ধূপ আর টর্চ, আর সৌরভের হাতে মোবাইল।
রাত তখন সাড়ে বারোটা। চারদিকে ঝিঁঝিঁর ডাক ছাড়া কোনো শব্দ নেই।
তারা গাছটার কাছে পৌঁছে দেখে—গাছটা যেন জেগে আছে। বাতাস নেই, তবু পাতাগুলো ধীরে ধীরে দুলছে।
দীপা ক্যামেরা সেট করে। অনিরুদ্ধ আশপাশ দেখে নিচ্ছে। সৌরভ হঠাৎ বলে, “কে ওখানে?”
কেউ যেন ধীরে ধীরে গাছটার উল্টো দিক থেকে সরে গেল। ক্যামেরার স্ক্রিনে এক মুহূর্তের জন্য দেখা গেল সাদা কাপড় ঢাকা এক অবয়ব।
কিন্তু বাস্তবে তাকালে কিছুই নেই।
হঠাৎ করেই বাতাস ঠান্ডা হয়ে আসে। পুকুরের জল কাঁপে। গাছের ডাল থেকে কিছু একটা নেমে আসে সৌরভের দিকে। সে চিৎকার করে ওঠে, “ওটা আমার নাম বলছে!”
দীপা আর অনিরুদ্ধ ছুটে গিয়ে দেখে—সৌরভ নেই। শুধু তার মোবাইলটা পড়ে আছে, স্ক্রিন ভাঙা।
তারা কোনোভাবে বাড়ি ফিরে আসে, ঘুমাতে পারে না।
পরদিন গ্রামে তোলপাড়। সবাই খোঁজে, পুলিশ আসে, কিন্তু সৌরভের কোনো খোঁজ মেলে না।
মোবাইলের শেষ ভিডিওতে দেখা যায়, সৌরভ দাঁড়িয়ে আছে গাছের দিকে মুখ করে, বলছে, “তুই কে রে? আমায় ডাকিস কেন?”
তারপর একটা বিকট হাহাকার শোনা যায়, স্ক্রিন কাঁপে, কিছু একটা ক্যামেরার দিকে এগিয়ে আসে, আর হঠাৎ সব অন্ধকার।
তারপর থেকে দীপা বদলে যেতে থাকে।
সে সারাদিন চুপ করে থাকে, রাতের বেলা খাটে বসে অজানা ভাষায় ফিসফিস করে। মাঝরাতে হঠাৎ উঠে বলে—“ও বলেছে আমায় ফিরিয়ে আনতে হবে... ওর শরীর দরকার...”
তার চোখ লালচে, মুখটা বিবর্ণ।
অনিরুদ্ধ ভয় পায়। সে খুঁজতে থাকে গাছ আর গ্রামের ইতিহাস। পুরোনো এক ডায়েরিতে সে পায়—এই গাছের নিচে বহু বছর আগে এক মহিলা, শালিনী, কৃষ্ণপক্ষের রাতে মানুষ বলি দিতেন তন্ত্রবিদ্যায়। তাকে একরাতে গাছে বেঁধে আগুনে পুড়িয়ে মারে গ্রামবাসীরা। কিন্তু তার আত্মা আজও মুক্ত হয়নি।
পুরোহিত বলেন, এই গাছ এক ধরনের প্রবেশদ্বার, একধরনের খোলা দরজা। কারো শরীর না পেলে প্রেতেরা প্রবেশ করতে পারে না। দীপা এখন সেই শরীর, যার ভিতর দিয়ে ও ফিরে আসতে চাইছে।
এক রাতে দীপা অদৃশ্য হয়ে যায়। সবাই খুঁজে না পেয়ে ধরে নেয়—সে হয়ত আত্মহত্যা করেছে।
কিন্তু অনিরুদ্ধ জানত, সে কোথায় গেছে। সে ও পুরোহিত মিলে আগুন ও মন্ত্রপাঠ নিয়ে গাছের কাছে যায়।
গাছের নিচে দীপা বসে ছিল। চোখ বন্ধ, ঠোঁটে হাসি, মুখে মন্ত্র। তার চারপাশে হালকা ধোঁয়ার মতো ছায়া ঘুরছিল।
পুরোহিত মন্ত্র পড়তে শুরু করতেই সে চিৎকার করে উঠল—“আমায় ফেরত দাও! এই শরীরটা আমিই নেবো! আমি এসেছি জন্ম নিতে! আমি শালিনী!”
তার মুখ বিকৃত হয়ে গেল। গলা পাল্টে গেল।
অনিরুদ্ধ কাঁপতে কাঁপতে দীপার সামনে আগুন ধরাল। সেই আগুনের ছায়ায় হঠাৎ যেন দেখা গেল—এক বৃদ্ধা রক্তাক্ত মুখে হাসছে।
মন্ত্রপাঠের শেষে দীপা জ্ঞান হারাল। চারদিক নিস্তব্ধ। কিন্তু হাওয়ার মধ্যে এক মিহি কণ্ঠ ভেসে এল—
“তুমি শুধু দরজাটা বন্ধ করেছো। চাবিটা এখনো আমার কাছেই…”
সেই ঘটনার পর দীপা সুস্থ হলেও কিছুই মনে রাখতে পারেনি।
সৌরভ আর ফেরেনি।
অনিরুদ্ধ এখন কলকাতায় থাকে, কিন্তু রাতে ঘুমাতে গেলেই যেন শুনতে পায় সেই কণ্ঠস্বর—
“আমার শরীর চাই…”
84
Views
0
Likes
0
Comments
0.0
Rating