আমি রুবিনা ইসলাম, বয়স বাষট্টি বছর আমি একজন বিধবা মহিলা ও একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী। আজ আমি আমার জীবনের গল্প বলবো। আমার একটা-ই ছেলে যার বয়স এখন সাতত্রিশ বছর। ওর নাম রাহাতুল ইসলাম ও থাকে কানাডা। আমার হাসবেন্ড যখন মারা যায় তখন আমার বয়স চল্লিশ বছর। আর আমার ছেলে রাহাতুল যাকে আমি রাতুল বলে ডাকি ও বয়স তখন পনেরো।
ছেলে কে আমি একা একা বড় করেছি। কখনো ছেলেকে কোন কিছুর অভাব বুঝতে দেই নাই। সব সময় চেয়েছি ওর সব চাহিদা মেটাতে। কখনো যেন না ভাবে - আমার বাবা থাকলে এ-ই চাহিদাটা পূরণ হতো। বাবা নাই বলে এটা পাচ্ছি না। ছেলে কে দেশের সব চাইতে ভালো স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়িয়েছি। তার পর ছেলে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়ে চলে গেলো কানাডা। সব খরচ একা হাতে সামলিয়েছি। সব সময় দেখতে চেয়েছি আমার সন্তান সফল! তার ভবিষ্যৎ উজ্জল করাই ছিলো আমার জীবনের লক্ষ। আমাকে সবাই সফল মা বলেন। এই নিয়ে আমারও একধরনের চাপা গর্ব আছে।
গত সপ্তাহে আমার এক পুরাতন বান্ধবীর সাথে দেখা হলো ওর নাম মিনা। ওর ছেলে আরিফ আমার ছেলে রাতুলের সাথে এক'ই স্কুলে পড়তো। ওর ছেলের সাথে অবশ্য রাতুলের খুব ভালো বন্ধুত্ব ছিলো না। এর কারণ হয়তো আমি বা আমার ছেলে রাতুল। আমি সব সময় চাইতাম রাতুল শুধু মাত্র ভালো স্টুডেন্ট যারা আর সব সময় পড়ালেখা নিয়ে কম্পিটিশন করে তাদের সাথে মিশবে। তাতে করে ওর ভেতরে পড়ালেখার প্রতি আরো বেশি প্রতিযোগিতার মনোভাব থাকবে।
মিনা সব সময় বলতো, ‘দেখ আমরা দু'জন কত ভালো বন্ধু। আর আমাদের ছেলেরাও এক'ই স্কুলে পড়ে, তার পরেও ওদের মধ্যে বন্ধুত্ব হলো না।’
মিনার ছেলে আরিফ সব ক্লাসে টেনেটুনে পাশ করে যেতো। তবে সব সময়ই স্কুলের খেলাধুলা অন্যান্য কার্যক্রম গুলোতে অংশগ্রহণ করতো। স্কুলের ওয়াল ম্যাগাজিনে ওর লেখা থাকতো, ছবি আঁকতো, এগুলো নিয়েই মিনা খুশি থাকতো। মিনার কথা, ‘আমার ছেলে'তো আর ফেল করে না! পাশ করে গেলেই হলো। সবার ছেলেতো ফাস্ট হবে না। আমার ছেলেটা পড়ালেখায় তেমন ভালো না কিন্তু ওর অন্য কাজ গুলো কত সুন্দর!’
আমার কাছে মিনার কথা গুলো অসহ্য লাগতো। মনে হতো, ছেলের মাথায় তো গোবর আছে। তার চাইতে বেশি গোবর মায়ের মাথায়। তা না হলে যে ছেলে পড়ালেখায় এত পেছনে পরে আছে। তাকে কোন মা স্কুলের এক্সটা কার্যক্রম নিয়ে সময় নষ্ট করতে দেয়!
রাতুল কলেজে উঠে দেশের সেরা কলেজে ভর্তি হলো আর আরিফ খুবই সাধারণ একটা কলেজে ভর্তি হলো। তার পর ওদের সাথে আর যোগাযোগ ছিলো না। গত সপ্তাহে শপিং মলে ওদের সাথে দেখা হলো। তাও আমি ওদের দেখি নাই। আমাকে মিনার ছেলে আরিফ দেখতে পেয়ে আমার কাছে এসে বলে,
- 'আন্টি আমাকে চিনতে পেরেছেন? আমি আরিফ।'
আমি আরিফকে আসলেই চিনতে পারছিলাম না। আরিফ কে যখন শেষ দেখি তখন মাত্র স্কুল ছেড়ে কলেজে যাবে। ছেলেমানুষি এখনো চোখেমুখে। আর এখন রীতি মতো ভদ্রলোক। তার পর আরিফ আমাকে মিনার কাছে নিয়ে যায়। মিনা একটা দোকানে বসা ছিলো।
মিনাকে নিয়ে ওর ছেলে শপিং এ এসেছে। তাও আবার মিনার জন্য তার ছেলে পছন্দ করে কি সব রংচঙে থ্রী-পিছ কিনছে। আমি আর মিনা সব সময় শাড়ি পরতাম, তাই আমি একটু অবাক হলাম। মিনা আমার কাছে বার বার জানতে চাইছিলো।
- 'তুই বল আমি কোনটা কিনবো আমাকে কোনটায় মানাবে?'
তখনই আরিফ হঠাৎ করে বলে বসে,
- 'আন্টি আপনি যেটা পছন্দ করবেন আম্মা সেটাই কিনবে।'
তার পর আমি একটা থ্রী- পিস পছন্দ করি আরিফ সেই একই থ্রী- পিস দুইটা কিনে আমি তা খেয়াল করি।
আমি আর মিনা গল্প করছিলাম কেনাকাটার ফাঁকে ফাঁকে। তারপর আরো কিছু টুকিটাকি কেনাকাটা করে ওরা। ওদের কেনাকাটা দেখে মনে হচ্ছিল ওরা কোথাও বেড়াতে যাবে। আমি আরিফ কে খেয়াল করছিলাম ও মিনার সাথে কেমন সহজ স্বাভাবিক ভাবে কথা বলে। মনে হয় আরিফ ওর মেয়ে কে নিয়ে বের হয়েছে শপিং করতে। তার পর আমাদের নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে যায়। আরিফ টুকটাক খাবার অর্ডার করে শেষে আরিফ বলে,
- 'আম্মা কফি খাবে নাকি ‘কোণ আইসক্রিম।'
মিনা বললো,
- 'আগে কফি খাব তারপর 'কোণ আইসক্রিম' খেতে খেতে বাসায় যাব।'
আমি বললাম,
- 'আমি শুধু কফি।'
মিনা সঙ্গে সঙ্গে বললো,
- 'তা হলে কোণ খাওয়া বাদ।'
খেতে খেতে শুনলাম ওরা বেড়াতে যাচ্ছে কক্সবাজারে সেখান থেকে সেন্ট মার্টিন। সাথে মিনাকে নিয়ে যাবে। যদিও সেটা আরিফের অফিসিয়াল ট্যুর। আরিফ একটা বায়িং হাউস এ আছে। বুঝতে পারলাম ভালো দায়িত্বে আছে। আমাদের সাথে বসা অবস্থায় কতবার যে মেইল চেক করলো। আর টুকটাক অফিসিয়াল কল রিসিভ করলো। তার মানে শত ব্যস্ততার মধ্যেও মা'কে শপিং করতে নিয়ে এসেছে।
ইতিমধ্যে আরো জানা হয়ে গেলো আরিফের বউ-এর কথা আরিফের বউ একটা মাল্টি ন্যাশনাল কম্পানিতে আছে। তাদের এক সন্তান সে এখন তার নানি বাড়িতে আছে। শপিং শেষ হলে আরিফ তার মেয়ে কে তার শ্বশুর বাড়ি থেকে তুলে নিবে।
আমি একটা বিছানার চাদর আর আমার জন্য টুকটাক বাজার করতে এসেছিলাম। আমি কিছুই কিনি নাই সেদিন। আমার কিছু কিনতে ইচ্ছে হচ্ছে না আর। আমি শুধু আরিফ কে দেখছিলাম। আরিফ কি ভাবে ওর মা'কে এত যত্ন করছে। স্যান্ডেলের দোকানে নিজে তার মায়ের পায়ে স্যান্ডেল পরিয়ে দিলো। মিনা এত দাম দিয়ে স্যান্ডেল কিনবে না। আরিফ তখন বললো, ‘আম্মা তুমি মূল্য দেখো কেন? তুমি দেখবে আরাম পাও কিনা?’
আরিফের কত খেয়াল তার মায়ের জন্য। সব শেষে সানগ্লাস কিনলো মায়ের জন্য। মিনা সানগ্লাস কিনবে না।তখন আরিফ বললো,
- 'মা সানগ্লাস কিনতে হবে কারন তুমি যখন সমুদ্রের ধারে হাটবে তখন তোমার চোখে রোদ লাগবে।'
ওদের মা - ছেলেকে দেখে আমার এমন লাগছে কেন? আমি আরিফ কে দেখছি, মিনাকে দেখছি। আর আমার ভেতরে কেমন হীনমন্যতা ঢুকে যাচ্ছে। বার বার মনে হচ্ছে আমি হেরে গেছি জীবনের কাছে। আমি একজন ব্যর্থ মা। যে তার ছেলেকে সব চাইতে সফল আর বড় বানাতে গিয়ে এত বড় বানিয়ে ফেলেছি যে, সেই ছেলের নাগাল আমি আর কখনো পাবো না!
এর মধ্যে কয়েকবার আরিফ রাতুলের কথা জানতে চেয়েছে। রাতুলের সাথে যোগাযোগের নম্বর চেয়েছে, আমি দেই নাই। বলেছি বাসায় আছে, নোট বইয়ে লেখা। আর রাতুল আমাকে কল দেয় সব সময়। আমি তো দেই না তাই মনে নাই। আসলে রাতুলের অনুমতি না নিয়ে ওর নম্বর কাউকে দিলে ও রাগ করবে। আমাকেই বলে,
- 'মা আমি অনেক বিজি থাকি, যখন তখন কল দিবে না। এতে করে আমার ডিসটার্ব হয়। তুমি এখনো কানাডা আর বাংলাদেশের সময়ে এডজাস্ট করতে পারো না কেন?'
আরিফ আমাকে আমাদের বাসায় নামিয়ে দেওয়ার সময় আমার হাতে একটা শপিং ব্যাগ দিয়ে বললো, ‘এটা আপনার জন্য।’ আমি দেখি ঠিক মিনার মতো আমার জন্যও একটা থ্রী-পিস কিনেছে আরিফ।
– 'আন্টি এটা আপনার জন্য। আপনারা দুই বান্ধবী এক সময় এক রকম জামা পরে বেড়াতে বের হবেন।'
আমার চোখে পানি চলে আসার অবস্থা হয়েছিলো তখন।
আরিফ আরো বললো,
- 'আন্টি আমার মোবাইল নং তো সেভ করে দিয়েছি আপনার যখন খুশি কল দিবেন, আমি এসে আপনাকে বাসায় নিয়ে যাবো।'
আমি তখন বললাম,
- 'তুমিও তো বিজি থাকো।'
তখন আরিফ বললো,
- 'আন্টি আপনার জন্য আমি সব সময়ই ফ্রি আছি।'
তারপর আরো বললো,
- 'আন্টি আপনি তো একা থাকেন আপনিও চলেন না আমাদের সাথে কক্স বাজার। আম্মা'র একজন সঙ্গী হবে। আম্মার আরো বেশি ভালো লাগবে।'
আমি মনে মনে কতক্ষন থেকে বলছি, ‘মিনা আমাকে নিবি তোদের সাথে কক্সবাজার? আমি সমুদ্র দেখবো না। আমি শুধু দেখবো একজন ছেলে তার মা'কে কত আদর যত্ন করে তা।’
আমি আরিফ কে বললাম,
- 'আরিফ আসলেই ঠিক বলেছো। মিনার সাথে কতদিন পর দেখা আমার। আমারও ভালো লাগবে তোমাদের সাথে বেড়াতে গেলে। কিন্তু রাতুল কে তো বলতে হবে। আমি আজ রাতুলের সাথে কথা বলে তোমাকে জানাবো।'
মিনা মনে হয় আমার কথায় অবাক হলো। আমি এত সহজে ওদের সাথে যেতে রাজি হবো এটা মিনা ভাবতেও পারে নাই।
মিনা আমার হাত জড়িয়ে ধরে বললো,
- 'রুবি প্লীজ চল, আমার অনেক ভালো লাগবে।'
তার পর ওরা চলে গেলো। আমি আমার আলো-হীন ঘরে ঢুকে, আজ আরো বেশি অন্ধকার দেখতে পেলাম। গতকাল রাতের বেলা রাতুলের সাথে হওয়া কথা গুলো ভাবতে লাগলাম।
.
রাতুলের বিয়ে, রাতুল একা-একা করলো কানাডায়। নিজে মেয়ে পছন্দ করলো আর যেহেতু মেয়েরা কানাডায় বহু বছর থেকে আছে। তাই বাংলাদেশে এসে বিয়ের করার প্রশ্নই আসে না। আমি টেলিফোনে ওদের আশির্বাদ করলাম। তার পর দেশে আসবে বলে আসলো না। তখন রাতুলের বউ-এর পড়ালেখা শেষ হয় নাই এর মধ্যে আসা যাবে না। রাতুলের ছেলে হলো এখন ছেলে ছোট তাই বাংলাদেশের আবহাওয়া বাচ্চা'র সহ্য হবে না তা-ই আসা যাবে না।
এবছর আমাকে কানাডা যাওয়ার জন্য সব কাগজ ঠিক করার কথা। গতকাল কল দিয়ে বললো, ‘এবার ছুটিতে ওদের সবাই কে নিয়ে রাতুলের শ্বশুর শাশুড়ী সহ সুইজারল্যান্ড যাবে। মা, আমরা সবাই চেষ্টা করবো আগামী বছর দেশে আসার তুমি মন খারাপ করো না।’
না আমি মন খারাপ করি নাই। আমি আজ আরিফ কে দেখে বুঝতে পেরেছি, শুধু ভালো ছাত্র আর সব সময় ফাস্ট হওয়া ছেলেরাই সেরা সন্তান হয় না। একজন সন্তান কে মানুষ করার ক্ষেত্রে আমি শুধু আমার ছেলেকে সেরাটা দিয়েছি। আর তাকে শিখিয়েছি ফাস্ট হতে হবে পরীক্ষার খাতায় আর চাকরির বাজারে।
'সেরা মানুষ হতে হবে' এটা আমি কখনো শেখাই নাই। আমি ওকে কখনো শেখাই নাই তোমার বন্ধুদের সহযোগিতা করবে। আমি শিখিয়েছি শুধু, 'প্রতিযোগিতা।' ওর কিসে ভালো হবে ওকে শিখিয়েছি। কিন্তু সবাইকে নিয়ে ভাবাটা শিখাতে পারি নাই।
আমি সব সময় রাতুল কে ভালো জিনিস কিনে দিয়েছি। ওর চাহিদা পূরণ করেছি। কিন্তু আমি কখনো আমার কোন চাহিদা আছে বা থাকতে পারে তা ওকে দেখাই নাই। আমি রাতুল কে কল দিবো না কক্সবাজার যাওয়া নিয়ে। এটা আরিফ কে বলার জন্য বলা। আজ মিনাদের সাথে দেখা হওয়ায় ভালো হলো। এখন থেকে আমি আমার ভালো লাগা মন্দ লাগা নিয়ে ভাববো। ছেলেকে নিয়ে আমার ভাবনা শেষ।
ছেলে কে তার ভালো থাকার জন্য সব করে দিয়েছি। ছেলের আর আমার কাছ থেকে পাওয়ার কিছু নাই। ছেলে আমাকে তার কাছে কানাডায় বেড়াতে নিয়ে যাবে বলে। গত দুই বছর থেকে আমার চলার টাকা থেকে একটু একটু করে যথেষ্ট টাকা জমিয়েছি। ওদের জন্য কত কিছু কিনবো তাই। এবার থেকে আমি আমার জীবনের ছোট ছোট চাওয়া গুলো পূরণ করবো। বাঁচব আর কটা দিন। খুব শখ ছিলো হিমালয় দেখবো আর মিশরের পিরামিড দেখবো! একা একা কি এগুলো দেখা যাবে? তার চাইতে এবার মিনার সাথে কক্সবাজার আর সেন্ট মার্টিন ঘুরে আসি তার পর একটু নিজেকে নিয়ে ভাববো।
প্রতিযোগিতা
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
258
Views
6
Likes
1
Comments
5.0
Rating