ঘড়ি, ডং ডং শব্দে জানান দিচ্ছে সন্ধ্যা ০৭:০০ বেজে গেছে। ওদের গায়ে হলুদের সমস্ত কার্যক্রম আর আয়োজন ইতোমধ্যে সমাপ্ত হয়ে গেছে। ওদের ছয় জনকে জোড়ায় জোড়ায় তিনটা স্টেজে পাশাপাশি বসানো হয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যে হলুদের পর্ব শুরু হয়ে গেল। আজমত সাহেব আর রেহানা বেগম একে একে সবাইকে একটু করে হলুদ লাগিয়ে দিলেন। মাইশার গায়ে হলুদ লাগানোর সঙ্গে সঙ্গে মাইশা কিছুটা কেঁপে উঠলো। কেমন একটা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে তার মামী রেহেনা বেগমের দিকে। ওর মন জুড়ে কেমন একটা অস্থিরতা আর শূন্যতা বিরাজ করছে। বিয়েটা মেয়েদের জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন আর সেই আনন্দের দিনে মাইশার কাছে তার বাবা-মা এমনকি তার শেষ প্রিয় মানুষটাও নেই। যার জন্য মাইশা নিজের একটা আলাদা পরিচয় পেতে চলেছে। যার জন্য ও এত ভালোবাসা অর্জন করতে পেরেছে সেই মানুষটাই আজ তার পাশে নেই, তার কাছে নেই। কথাগুলো ভেবেই ওর চোখ জোড়া পানিতে ঝাপসা হয়ে এলো। ওর এক চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়বে ঠিক সেই মুহূর্তে আরিয়ান মাইশার চোখের পানির ফোঁটা টা তার আঙ্গুলের মাথায় নিলো। অন্য চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ার আগেই আরিয়ান খুব যত্ন সহকারে তা মুছে দিল। মাইশা হালকা করে তার ঘাড় টা ঘুরিয়ে আরিয়ানের দিকে তাকালো। আরিয়ান মাইশার একটা হাত ওর হাতের মুষ্টি যুগুলে নিয়ে আরিয়ান তার চোখ জোড়া দিয়ে মাইশা কে ইশারা করে ভরসা মূলক ইঙ্গিত দিয়ে কিছু একটা বোঝালো। মাইশা কিঞ্চিত মৃদু একটা হাসি দিল।
আরিয়ান মাইশার ঠোঁটের সেই কিঞ্চিত হাসি টার দিকে তাকিয়ে মনে মনে আওড়ালো,
" অনেক চেষ্টা করেও একজনকে আমি ধরে রাখতে পারিনি তবে যাকে আমার জীবনে পেয়েছি তাকে আমার জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও রক্ষা করব আর এটাই আমার ওয়াদা।
এদিকে এত আনন্দের মধ্যেও সীমার মনটা অনেকটাই খারাপ। সীমার চোখ জোড়া আর উতলা মনটা তার পারুল খালাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে কিন্তু মুখ ফুটে তা বাইরে প্রকাশ করতে পারছে না। সীমা মাথা নিচু করে অনেকটা অশ্রু ভরা চোখ নিয়ে বসে আছে।
হঠাৎই একটা পরিচিত কন্ঠ সীমার সামনে দাঁড়িয়ে বলে উঠলো,
" এত সুন্দর চাঁদ মুখটা গোমড়া করে রাখলে কি আমার মেয়েটাকে সুন্দর দেখায়।
পরিচিত কণ্ঠ স্বরটা শুনেই সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলে সামনের দিকে তাকালো সীমা। খুশিতে সীমার চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। সীমা উচ্ছ্বাসিত কন্ঠে বলে উঠলো,
" খালা তুমি।
পারুল সীমার চোখের পানি মুছে দিয়ে স্টেজের এক কোণে বসে বলল,
" মেয়ের বিয়েতে মা যদি না আসে তাহলে কি বিয়ে সম্পন্ন হয় বল।
কথাটা বলে পারুল বেগম হলুদের বাটি থেকে কিছুটা হলুদ দিয়ে সীমার গালে লাগিয়ে দিল। একটা বক্স বের করে তার ভিতর থেকে একজোড়া বালা বের করে সীমার হাতে পরিয়ে দিয়ে বলল,
" আমার তো কোন সংসার, ছেলে বা মেয়ে কিছুই নেই, আমার জীবনের যতটুকু সঞ্চয় ছিল সব টুকু দিয়ে আমার তরফ থেকে সামান্য উপহারটা আমি তোকে দিলাম।
সীমা হাত দিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বালা জোড়া দেখেছিল। মনের ভিতর তার আজ অন্যরকম এক অনুভূতি নাড়া দিয়ে উঠছে। সীমা মনে মনে ভাবছে,
" তার মা বেঁচে থাকলে হয়তো আজকে এভাবেই তাকে দোয়া করত।
সীমা পারুল বেগমের হাত জোড়া ধরে অতি ভালোবাসা মিশ্রিত কন্ঠে বলল,
" কে বলেছে তোমার কেউ নেই। আমি তো আছি তোমার মেয়ে। এখন থেকে তুমি আমার মা তুমি আমার সবকিছু।
সীমার মুখ থেকে এমন কথা শুনে আনন্দে পারুল বেগমের চোখে পানি এসে পড়ল। সত্যিই আজ উনার জীবনটা সার্থক মনে হচ্ছে। জীবনে আজ আপন বলতে সীমাকে সে মেয়ে হিসাবে পেয়েছে এটাই তার জন্য অনেক বড় পাওয়া।
নাচে গানে হৈ হুল্লোড়ে মেতে উঠেছে হলুদ সন্ধ্যা। দারোয়ান মতিন একপাশে দাঁড়িয়ে সব টা দেখে যাচ্ছিল। ওরও ইচ্ছে করছিল সবার মত হৈ হুল্লোড় করতে। কিন্তু ও যে এই বাড়ির সামান্য একজন দারোয়ান । ওকে তো আর এই সবকিছু মানায় না। তাই চুপচাপ এক পাশে সবকিছু দাঁড়িয়ে দেখা ছাড়া ওর আর কোন উপায় ছিল না।
হঠাৎই ওর মনে পড়লো ও তো গেট ছেড়ে এখানে চলে এসেছে আরিয়ান স্যার যদি জানতে পারে তাহলে তো ওর চাকরি থেকেই ওকে বের করে দেবে। আর এ সময় ও চাকরি থেকে ছাঁটাই হলে ওর পরিবার আর ছেলেমেয়েকে নিয়ে রাস্তায় নামতে হবে। তাই অনেকটা সত্ত্বেও ওখান থেকে চলে যাবার জন্য পা বাড়ালো। তখনই.....
চলবে.....
প্রেম আমার সিজন ২
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
430
Views
5
Likes
2
Comments
5.0
Rating