"এই, এভাবে কেউ চা খায়। ভদ্রভাবে খা বলছি," জুঁই আপুকে একটু শাসিয়ে শারমিন আপু নিজেও চায়ে চুমুক দিল। আপুদের বাসার দরজা খোলাই ছিল।
"ভাবি, ভাবি তাড়াতাড়ি নিচে চলেন," আমার মামনি হঠাৎ এসে বললেন। শারমিন আপু অপ্রস্তুত হয়ে বলল,"আন্টি কী হয়েছে? বসেন আন্টি। ঐ হা করে কী দেখছিস? আন্টিকে চা দে।"
- "নানা জুঁই। ব্যস্ত হয়ো না শারমিন। তোমার আম্মুকে ডাকো তো।"
- আম্মুর নামাজ পড়া হয়তো শেষ হয়নি আন্টি। আপনি একটু বসেন।
"কী হয়েছে রিতুর মা ভাবি ? আমাকে ডাকছিলেন ?" আন্টি এসে বললেন।
- "হ্যাঁ ভাবি। নিচে মনে হচ্ছে কোন সমস্যা হয়েছে। চেঁচামেচির আওয়াজ আসছে।"
- "নিচতলার কিছু ভাড়াটিয়ারা দেখেন না মাঝে মাঝে স্বামী-স্ত্রী ঝগড়া বাঁধিয়ে পুরো বিল্ডিংটা মাথায় তোলে। তাই হবে হয়তো।"
- "সেরকম মনে হচ্ছে না ভাবি। আওয়াজটা কান্নাকাটির। ঐ যে দেখুন আবার আসছে।"
- "তাই তো। কার কী হলো। চলুন তো ভাবি দেখি।"
শারমিন আপু বলল, "রিতুকে আমাদের কাছে দিয়ে যান আন্টি।" তারপর আমি একটা বই নিয়ে জুঁই আপুদের বাসায় চলে গেলাম। আমরা খুব ভালো সময় কাটাচ্ছিলাম ৩ জনে। হঠাৎ মামনি আর আন্টি এসে আমাদের জানালো নিচতলার সেতুর ভাই আবির নাকি মারা গিয়েছে। ওরা পরিবার মিলে গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিল। আর সেখানে আবির পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করেছে। আমরা সবাই আবিরদের বাসায় গেলাম। ৩ তলা বিল্ডিংটার সমস্ত ভাড়াটিয়ারাই। বাড়িওয়ালারাও সেখানে গিয়েছিলেন। সবাই মিলে আবিরের আম্মুকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন। কিছুক্ষণ ওখানে থাকার পর বিল্ডিংটার ৩ তলার ভাড়াটিয়ারা অর্থাৎ আমরা, জুঁই আপুরা ও নাসরিন আন্টিরা নিচ তলা থেকে ৩ তলার দিকে একসাথেই রওনা দেই। শুধু জুই আপুর আম্মু আবিরের আম্মুর কাছে তখনও ছিলেন। আমরা সবাই এসে জুঁই আপুদের বাসায় বসলাম। বলে রাখি, ঐ বিল্ডিংটার ৩ তলার এই ৩টা ভাড়াটিয়াদের অর্থাৎ আমাদের সবার মাঝে ভীষণ ভালো সম্পর্ক ছিল। জুঁই আপুদের বাসায় বসে তখন সবাই শোক প্রকাশ করছে। বিভিন্ন কথাবার্তা ও শোক প্রকাশের মাঝে নাসরিন আন্টি বললেন, "একটা জিনিস খেয়াল করলাম। টিউবওয়েলের পাশে যে তেঁতুল গাছটা আছেনা, যেটার ডাল ধরে আবির মাঝে মাঝে ঝুলে থাকতো, সেই গাছটাও না আজকেই মারা গেছে।"
শারমিন আপু বলল, "ওমা, কী অদ্ভুত।" মামনি এটাকে পাত্তাই দিল না, "এতে আবার কী হইছে। বাদ দেন।"
তারপর জুঁই আপুর আম্মু বাসায় ফিরলেন। জুঁই আপু, শারমিন আপু অন্য কক্ষে পড়তে চলে গেল। আমাকে মামনি বই নিয়ে ওখানেই পড়তে বসতে বলল যেখানে এখন ৩ প্রতিবেশী একসাথে আছেন। কারণ আমি ভয় পেতে পারি একা এখন ঘরে থাকতে যেহেতু তখন অনেক ছোট ছিলাম আর কেউ মারা গেছে এমন কিছু দেখে এসেছি। আন্টিরা শোক প্রকাশ করছিলেন। কী ভাবছেন ? এখানেই ঘটনা শেষ, না, কয়েকদিন বাদেই ঘটল আসল ঘটনা।
প্রতিদিন শারমিন আপু টিউবওয়েল থেকে পানি নিয়ে আসে। একদিন জুঁই আপুকে নিয়ে আসতে জোর করে শারমিন আপু। জুঁই আপু রাগে রাগে কলসটা নিয়ে নিচে নেমে টিউবওয়েলের কাছে গেল। রাগে রাগে কল চাপার আগে জুঁই আপু যা দেখল তাতে আপু রাগের কথা ভুলে গেল কারণ রাগের জায়গাটা দখল করেছে ভয়। পাশের তেঁতুলগাছটা একেবারে জীবিত আর তার চেয়েও ভয়ঙ্কর বিষয় হলো গাছে উঠে বসে আছে সম্প্রতি পরলোকগমন করা ডানপিটে ছেলে আবির।
- "আবির, তুই, কীভাবে? তুই তো সেদিন গ্রামে বেড়াতে গিয়ে পুকুরে ডুবে মারা গিয়েছিলি। তোর লাশটাও এরপর আমরা দেখিনি। গ্রামেই তোকে নাকি কবরস্থ করা হয়েছিল। তুই এখানে এলি কীভাবে ?"
- "মুই ডুইবা মরমু ক্যান জুঁই আফু। মুই খুব ভালামতন সাঁতার জানি।"
- "তা--তাহলে ?"
- "মনে হইছিল কেউ ঠাইসা ধইরা চুবাইতেছে।"
- "কে ?"
এর উত্তরে আবির চোখ-মুখে অদ্ভুত ভঙ্গি এনে অদ্ভুত স্বরে গগণবিদারী কন্ঠে হাসতে লাগলো।
- হাহাহাহাহাহাহাহা
হঠাৎ আপু খেয়াল করল আশে-পাশে যারা আছে, তারা নিজেদের মতনই রয়েছে যেন আপু ও আবিরকে কেউ দেখতে পাচ্ছে না। এমনকি আবিরের চিৎকারও যেন কেউ শুনতে পাচ্ছে না। আপু পরিচিত কয়েকজনকে ডাকল কিন্তু কারও সেদিকে ভাবান্তর নেই। আপু এবার সহ্য করতে পারছে না ভীষণ ভয় করছে তার। এমন সময়ই আপু দেখল ৩ তলার জানালা দিয়ে শারমিন আপু জুই আপুকে ডাকছে।
- "জুঁই, এই জুঁই। জুঁই। ওঠ ভোর হয়ে গেছে। কখন থেকে ডাকছি শুনছিস না। নামাজ পড়ে নে। এই জুঁই।"
জুঁই আপু চোখ খুললো এবং দেখলো সে নিজের রুমে নিজের বিছানাতেই আছে। এতক্ষণ যাবত সে যা দেখেছে তা স্বপ্ন। কিন্তু খুবই বাস্তব হয়ে ধরা দিয়েছিল কিছুক্ষণ আগে। স্বপ্নের কথাটা সেদিন সকালে নাসরিন আন্টিদের বাসায় নাসরিন আন্টিকে জুঁই আপু বলেছিলেন। মামনি ও আমিও সেখানে উপস্থিত ছিলাম। কিন্তু মামনি এবারও এ বিষয়টিকে আমলেই নিলেন না।

কোন মন্তব্য নেই