ভয়াবহ জানালা

২০২২ সালের কথা। আমি একাদশ শ্রেণির ছাত্রী। যশোর এমএম কলেজে পড়ি। কলেজের পাশেই একটা মেসে আমি থাকি। আমার রুমের জানালার বাইরে একটি নতুন ভবন হচ্ছে। আমি তিন তলাতে থাকি। ভবনটা দুই তলা কমপ্লিট করা হয়েছে যদিও তিন তলার জন্য পাচিল করা হয়ে গেছে। এখন মূল ঘটনায় আসি। না, এখনি মূল ঘটনায় আসা যাবেনা। তার আগে মূল ঘটনার তিন দিন আগে ঘটে যাওয়া ঘটনা জানাই। রাত্রেবেলা পড়া শেষ করে লাইট অফ করে বিছানায় শুয়েছি। সারাদিন ক্লাস, কোচিং,প্র্যাকটিকাল আর সারারাত সব পড়া কমপ্লিট করা। যেভাবে সাইন্সের স্টুডেন্টদের ইন্টারমিডিয়েট কাটে আরকি। এসবের মাঝে ঘুমানোর আগে ফেসবুকে ঢোকার একমাত্র সময়। তাই শুয়ে ; না ঘুমিয়ে আগে মোবাইল টা হাতে নিয়েছি। মোবাইল রেখে ঘুমিয়ে পড়বো ঠিক তখন জানালার কাঁচে ছোট ছোট দুটো বিড়ালের হাতের মতো ছায়া দেখতে পেলাম। ছায়াটা এমনভাবে নড়ছে দেখে মনে হচ্ছে জানালার বাইরে কোন বিড়াল ওর হাত দিয়ে কাউকে টাটা দিচ্ছে। জানিয়ে রাখি আমি খুবই ভূতের গল্প পড়তে ভালোবাসি। অনেক ছোটবেলা থেকেই ভুতের গল্প পড়ি। অনেকদিন ধরে ভূতের গল্প পড়তে পড়তে একটা জিনিস খেয়াল করেছি, যদি কেউ তার সামনে ভৌতিক কিছু দেখে তখন সেটাকে পাত্তা না দিয়ে কাশি দেয়া, জোরে কোন কিছু শব্দ করা বা অন্ধকার ঘরে আলো জ্বালিয়ে দেয়া এমন কিছু কাজ করলে পরবর্তীতে সেই ভৌতিক জিনিসটা আর দেখা যায় না। আর আমি এটাও জানতাম অন্ধকারের মধ্যেই শয়তান আমাদের অ্যাটাক করতে পারে। আলোর মাঝে শয়তান আমাদের সেভাবে অ্যাটাক করতে পারে না। তৎক্ষণাৎ আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইত্বনির রজিম পড়ে ঘরের লাইট জ্বালিয়ে দিলাম। ব্যস, যা হবার তাই হলো। সেই ছায়াটাকে আর দেখা যাচ্ছে না। সেই সারারাত আমি লাইট জ্বালিয়েই ঘুমালাম। এরপর ঘটনাটা এই পর্যন্ত এসে ইতি ঘটলেই ভালো হতো। কিন্তু তা হলোনা। এইবারই ঘটল আসল ঘটনা। শনিবার রাত ২ টা। শনিবার এবং রবিবার এই দুইদিন হচ্ছে উদ্ভিদবিজ্ঞান ও প্রাণিবিজ্ঞান প্রাক্টিক্যাল। এত কঠিন জিনিস আঁকাতে হয় যা আঁকতে এক একটা চিত্র প্রায় ২০ মিনিট লেগে যায়। এরপর লেখা তো বাকি। তাই শনিবার রাতেই শনিবার এবং রবিবার এর প্র্যাকটিকাল গুলো করে রাখতে হয়। শনিবার রাত দুইটা। প্রাক্টিক্যাল করছি, ভুল হচ্ছে আবার মুছছি। করতে করতে হাত ব্যথা হয়ে গেল। পেন্সিল টা রেখে হাত টা টিপছি।
হঠাৎ জানালার দিকে চোখ গেল। ভূতের গল্প লেখকদের ভাষাতেই বলি ; যা দেখলাম তা দেখার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। আমি দেখলাম, মানবদেহের কঙ্কালের মতো এক জোড়া হাত জানালার ঠিক বিপরীত পাশে ছায়া সদৃশ দৃশ্যমান।প্রাণিবিজ্ঞান ম্যাডাম সেদিন প্র্যাকটিক্যালের সময় ঠিক যেরকম কঙ্কালের হাত দেখিয়েছিলেন ঠিক তেমন হাতের মতোই ছায়াটা দেখা যাচ্ছে। এবার আর আগের দিনের মতো সাহস দেখাতে গেলাম না। প্র্যাকটিক্যাল খাতা গুলো এদিক-সেদিক উল্টে ফেলে বিছানা থেকে নেমে এক দৌড়ে দরজার ছিটকিনি খুলে পাশের রুমের আপুদের ডাকতে লাগলাম। 😧 সিঙ্গেল রুমে থাকাতে আমার সাথে কেউ নেই যার কারণে আমাকে বাইরে গিয়ে অন্যদের ডাকতে হচ্ছে। এই আপুরা বোধহয় ঘুমিয়ে গেছে কিছুতেই দরজা খুলছে না। পাশে আরেকটা রুম আছে যেখানে রানী আপু থাকেন। তার দরজা অনবরত বিরামহীন নক করছি। উনি তখনও ঘুমাননি। কারো সাথে ফোনে কথা বলছিলেন। বোধহয় রাজা ভাইয়ের সাথে।😁 শ্বাসকষ্টের রোগীদের মত হাঁপাতে হাঁপাতে ওনাকে সব ঘটনা খুলে বললাম। উনি তৎক্ষণাৎ ফোন রেখে আমাকে সাহস দিয়ে আমার সাথে আমার রুমে এলেন। আমি আগে থেকেই জানতাম ওটা এখন আর দেখা যাবে না। এটা আমি বিভিন্ন ভূতের গল্প পড়েই বুঝতে পেরেছি। আপু বলছেন কই এখানে তো কিছু নেই। আমি বলতে যাব যে আপু এখানে সত্যিই এমনটা দেখেছি তার আগেই আবারো দুইহাত আগের মত দৃশ্যমান হলো বন্ধ জানালার বিপরীত পাশে। এবার আমি আর কি ; রানী আপুই চিৎকার দিয়ে পাশের রুমের দরজা ধাক্কা দিলেন। এক ধাক্কাতেই খুলে গেল। আসলে আমি আগে জানতাম না এ রুমে থাকা তিনটে আপু দরজা আটকাননা। শুধু টেনে দিয়ে রাখেন। দুজনে বিনা অনুমতিতে আপুদের ঘরে প্রবেশ করলাম হাঁপাতে হাঁপাতে চেঁচাতে চেঁচাতে। তিনটে আপুর ঘুম ভেঙে গেল। প্রত্যেকে জিজ্ঞেস করছেন কী হয়েছে। আমি কিছু বললাম না। রানী আপু সব খুলে বললেন উনাদের। এরপর ওই আপুদের রুমেই এক ঘন্টার মতো আমি আর রানী আপু অবস্থান করলাম। কেউ কারো রুমে যাইনি। আপুদের কথোপকথনে এটা বুঝতে পারলাম ওটা কোন কঙ্কালের হাত ছিল না। চিকন কোন মানুষের হাত ছিল। পাশের বিল্ডিং টা দিনে মিস্ত্রি যতই থাকুক রাতে পুরো অরক্ষিত থাকে। যার কারণে তিনতলার ওই পাঁচিলটাতে উঠে আমার জালনা দিয়ে হাত দেখিয়ে ভয় দেখিয়েছে। হয়তবা জানালা খুলতে চেয়েছিল কোনভাবে কিছু চুরি করার জন্য ।

আপুরা আমাকে অ্যাডভাইস করলেন জানালা যেন দিনের বেলাতেও খোলা না রাখি। কোন ভাবে কিছু চুরি হয়ে যেতে পারে আমার অনুপস্থিতিতে। কারণ একে তো সিঙ্গেল রুমে থাকি তার ওপর সারাদিন কলেজ, কোচিং এসবে ব্যস্ত। আর রাতের বেলা ছায়া দেখে যাতে ভয় না পাই তার জন্য যেন পর্দা দিয়ে রাখি। এই ভবনটার দুই তলার কাজ চলাকালীন দুই তলার সিঙ্গেল রুমের আপুটাও অভিযোগ করেছিল রাত্রেবেলা জানালায় কেউ হাত দেখিয়ে ভয় দেখায়। যাহোক, বুঝতে পারলাম এটা মানুষ। চোর হোক যা হোক মানুষ। ভূত ভেবে ভয় পেয়ে বোকামি করেছি। সেদিন আর আমার রুমে গিয়ে প্র্যাকটিক্যাল শেষ করা হলো না। কারণ এমনিতেই এসবের মাঝে সাড়ে তিনটে বেজে গেছে। এখন না ঘুমালে নামাজ পড়তে উঠতে হয়ত পারব না। উঠতে পারলেও পরে হয়তো কোচিং ধরতে পারব না। তাই বুদ্ধিমানের কাজ এখনই ঘুমিয়ে পড়া। তাছাড়া আজকের প্র্যাকটিক্যাল তো হয়ে গেছে। কালকের চারটার মধ্যে দুইটা হয়নি। সেটা না হয় কালকে করা যাবে। আপুরা আমাকে আমার রুমে গিয়ে ঘুমাতে বারণ করলেন। রানী আপু ২ সিটের রুমে থাকেন। একটা বেড খালি। বর্তমানে শুধু রানি আপুই রুমটাতে আছেন। আমার রুম থেকে বালিশ, চাদর নিয়ে রানী আপুর রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। রাতের বেলা বলে মামনি-আব্বুকে কিছুই জানাইনি। পরবর্তীতে সকালে ফোনে বললাম।







14 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই