স্টেশনে যাওয়ার পথে অশোকের বার বার যেন মনে হচ্ছিলো কেউ তাকে অনুসরণ করছে। কিন্তু পিছনে তাকাতেই জনমানবশূন্য বিস্তর ফাঁকা রাস্তা ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়লো না অশোকের।
নিস্তব্ধ গ্রাম্য রাস্তায় এবার অশোকের একা একা হাঁটতে একটু ভয়ই লাগছিলো। কিন্তু তাও কোনো উপায় নেই। তার মাথায় কেবল একটা চিন্তাই ঘুরপাক খাচ্ছিলো - যে করেই হোক তাকে আজ রাতের মধ্যেই গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে যেতে হবে, নয়তো তার সমূহ বিপদ। এই কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই অশোক একটা সিগারেট ধরালো আর বাকিটা রাস্তা হাঁটতে লাগলো।
অবশেষে আরও বেশ খানিকটা হাঁটার পর ট্রেন স্টেশনে এসে পৌঁছালো অশোক। স্টেশনে পৌঁছেই অশোক রেল মাস্টারের কাছে জিজ্ঞেস করলো শহরে যাওয়ার ট্রেন আসতে আর কত সময় লাগবে।
উত্তরে রেল মাস্টার জানান যে বৃষ্টির জলে ট্রেন লাইন ডুবে থাকায় ৮:০০ টার ট্রেন আসতে প্রায় আরও এক ঘন্টা দেরী হবে।
রেল মাস্টারের মুখে এমন কথা শুনে অশোক যেন খুবই হতাশ হয়ে পড়লো। সে যতই তাড়াহুড়ো করছিলো শহরে যাওয়ার জন্য ততই যেন পরিস্থিতি তাকে বাঁধা দিচ্ছে প্রতিটা মুহূর্তেই।
হাতে আর কোনো উপায় না পেয়ে অশোক ট্রেন স্টেশনেই বসে রইলো ট্রেন আসার অপেক্ষায়। স্টেশনের চারপাশটাতে তখন ভয়াবহ নীরবতা বিরাজ করছে। অশোক স্টেশনের আশেপাশে চেয়ে দেখে জনমানবশূন্য এই ট্রেন স্টেশনে সে একাই অপেক্ষারত যাত্রী। যার সঙ্গী বলতে কেবলই রয়েছে স্টেশনের পাশে চলাচল করা কয়েকটা রাস্তার কুকুর।
এদিকে তখন শীতও লাগছিলো অশোকের। তাই সে গায়ে চাদর দিয়ে স্টেশনে থাকা বেঞ্চের ওপর বসে রইলো। একটু পর পরই হাতে থাকা হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে লক্ষ্য করছিলো ট্রেন আসতে আর কত দেরী!
এমন সময় হঠাৎই অশোক দেখলো তার থেকে দুই বেঞ্চ দূরে কেউ একজন বসে রয়েছে। একে তো রাতের বেলা তার ওপরে শীতকালের ঘন কুয়াশায় ঢাকা পরিবেশ, তাই অশোক স্পষ্ট করে কিছুই দেখতে পেলো না। তবে এটা ভেবে স্বস্তি পেলো যাক অন্তত সে ছাড়াও স্টেশনে কেউ একজন তো আছে তার মতোই অপেক্ষারত পথযাত্রী।
এতক্ষণ ধরে স্টেশনে একা একা বসে থেকে অশোকের যখন খুব বিরক্ত লাগছিলো তখন সে ভাবলো স্টেশনে থাকা ঐ ব্যক্তির সাথেই কথা বলা যাক। তাতে অন্তত কথা বলার মাঝে সময়টাও কেটে যাবে আর একা একা অস্বস্তি বোধও হবে না।
যেই ভাবা সেই কাজ।অশোক নিজের বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়ালো। আস্তে আস্তে পাশে বসে থাকা লোকটার বেঞ্চের দিকে এগোতেই দেখলো একটা মেয়ে চাদর মুড়ি দিয়ে বসে আছে ট্রেনের অপেক্ষায়। তাই তখন তার মুখটা দেখা যাচ্ছিলো না।
অশোক প্রথমে নিজে থেকেই কথা বলা শুরু করলো। অশোক মেয়েটাকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করলো- সে কোথায় যাবে আর এত রাতে একটা মেয়ে হয়ে একা একাই বা কেন এই স্টেশনে বসে আছে।
অশোকের প্রশ্নের উত্তরে সেই মেয়েটি বললো-" আমি এই গ্রামেরই মেয়ে। আর একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার জন্যেই শেষ রাতের ট্রেনে করে শহরে যেতে হবে। তাইই এখন বসে বসে ট্রেনের অপেক্ষা করছি। "
এরপর আরো বেশ কিছুক্ষণ অশোক আর সেই মেয়েটার মধ্যে কথাবার্তা হয়। কথাবার্তার এক পর্যায়ে অশোক বললো-" দেখুন তো কথায় কথায় আপনার নামটাই জানা হলো না। কি নাম আপনার?"
এই প্রশ্নের উত্তরে মেয়েটি একটা হাসি দিয়ে বললো-" এত সহজেই বুঝি ভুলে গিয়েছো তোমার নন্দিনীকে, তাই এখন হয়তো তার নামটাও জিজ্ঞেস করতে হয়!"
মেয়েটার মুখে এমন একটা কথা শুনে অশোকের হুঁশ উড়ে যায়। চট করে তাকাতেই দেখলো চাদর ঢাকা দেওয়া মেয়েটা আর কেউ নয় তার প্রেমিকা নন্দিনী। এটা দেখা মাত্রই অশোক বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো। আর ভয় ভয় কণ্ঠে বললো-" নন্দিনী তুমি এখানে? আর তুমি কিভাবে জানলে আমি আজ রাতেই শহরে যাচ্ছি। "
চলবে....
প্রতারণা (৮ম পর্ব)
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
639
Views
3
Likes
0
Comments
5.0
Rating