নিশিডাক মেডিকেল

নিশিডাক মেডিকেল
#গল্প-'নিশিডাক মেডিকেল'
কলমেঃ- সাদিকুল ইসলাম
পর্ব-৩

এম্বুল্যান্স থেকে খালার অজ্ঞান বডিটা সিট নিয়ে নিচে পড়ে যাচ্ছে, আমি দৌড়ে গিয়ে ধরলাম।
অদৃশ্য কেউ যেন ঠেলে বের করে দিতেছে এম্বুল্যান্সের সিটটা। খালাকে গাড়ির ভেতরে ডুকানোর জন্য গাড়ির সিট ধরে প্রাণপন ধাক্কা দিতে লাগলাম ভেতরের দিকে। কিন্তু, আমি একা পারছিলাম না। ভেতর থেকে কে যেন খালাকে ঠেলে বের করে দিতেছে। ভয়ে ড্রাইভারকে ডাক দিয়ে বললাম,-" ভাই একটু ধরেন, খালা সিট নিয়ে পড়ে যাচ্ছে।"
ড্রাইভার, কোদাল রেখে সাথে সাথে দৌড়ে এসে ধরলো। দু'জনে মিলে অনেক কষ্টে ঠ্যালাঠেলি করে খালাকে গাড়ির ভেতরে ডুকালাম। গাড়ির পেছনের শাটারটা শক্ত করে লাগালাম। ঘেমে গেছি দু'জনই।

চারদিকে ঝিঁঝি পোকার ডাকে কান রাখা যাচ্ছে না। শেষ রাতের নিশি লাগছে মনে হয়। এই সময়টাতে ভূত-পেতের আনাগোনা বেশি হয় নাকি। মনে হচ্ছে আমরা মাঝ জঙ্গলে আছি এখনো।

ড্রাইভারের পরিশ্রম এখনো কাটেনি। তিনি হাঁপিয়ে বলতেছে,- "আমি বেঁচে থাকতে আর কোনো দিন এই রাস্তায় গাড়ি নিয়ে আসবো না। তাড়াতাড়ি চাকার নিচে মাটি দাও। এখন যদি গাড়ি না উঠে, আমি গাড়ি রেখেই চলে যাবো।"

এই কথা শুনে মনটা আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।
আমার শরীরটায় মশা মারার শক্তিটুকুও নেই মনে হচ্ছে। তবুও, কি আর করার আছে, গাড়িটা যেভাবেই হোক তুলতে হবে। তা না হলে এখান থেকে কেউ'ই বেঁচে ফিরবো না মনে হয়।

মা'কে বললাম, খালার পাশে বসার জন্য। কিন্তু মা এখন খালাকে দেখে ভয় পাচ্ছে। খালার পাশে বসতে চাচ্ছে না। কিছুক্ষণ আগে খালা মায়ের দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকাচ্ছিলো। ভয় পাওয়ার'ই কথা। কি যে করি!..

গাড়ির সামনের দরজাটা খুলে মা'কে ড্রাইভারের সিটে বসালাম। খালা পিছনের সিটে মরা লাশের মত পড়ে আছে। আমি আর ড্রাইভার মিলে মাটি কেটে চাকার নিচে দিচ্ছি। মনে মনে আল্লাহকে ডাকতেছি।
-'এই বিপদ থেকে উদ্ধার করো মাবুদ।'

পাশের ঝোপঝাড় থেকে কেমন একটা আওয়াজ আসতেছে। মনে হচ্ছে কেউ তীব্র গতিতে হেঁটে যাচ্ছে। আওয়াজটা শুনে দু'জনেই অনেক ভীত হয়ে পড়ি।
ড্রাইভার কোদাল রেখে দাঁড়িয়ে পড়ে।
ভাবলাম, 'ড্রাইভারকে সাহস দিতে হবে। নতুবা ভয় পেয়ে উনি একা চলে যেতে পারে।'
ভয়ে শরীর কাঁপতেছে!
উনাকে সাহস দিয়ে বললাম,-"ভাই, ওসব কিছু না, মাটি দেন আমার হাতে।"

উনিও আবার কাজ শুরু করলেন। কিচ্ছুক্ষণ মাটি দেবার পর ড্রাইভার বলতেছে,- "আর বেশি লাগবে না, সামনের চাকাটায় অল্প মাটি দিলেই হবে।"

মাটি কাটা প্রায় শেষ। এমন সময়, মা হঠাৎ জোরে চিৎকার দিয়ে উঠে 'অয়ন' বলে! মায়ের চিৎকার শুনে আমি থড়থড় করে কেঁপে উঠি। মা লাফ দিয়ে গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে।
এসে বিস্মিত স্বরে বলতেছে,-"তোর খালা গাড়িতে নেই।"

আমি এগিয়ে গেলাম, দেখি, খালা সত্যিই নেই। শুধু খালি সিটটা পড়ে আছে। গাড়ির পিছনে তাকিয়ে দেখি, 'গাড়ির পেছনের ঢালা খোলা।'
-ও মাই গড! এটা কি হলো!?
আমার মাথাটা কেমন জানি করতেছে, চারদিক ঘুরতেছে। গাড়িতে ভর দিয়ে দাঁড়ালাম। কলিজাটা শুকিয়ে আসতেছে।
আল্লাহ আর কত বিপদের সম্মুখীন করবে!? মা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছে।

নিজেকে নিজে সাহস দিলাম, মরলে মরবো, তবু খালাকে রেখে যাবো না। আমি বুঝে গেছি, 'অশরীরী আত্মা ভর করে খালাকে নিয়ে গেছে।' ড্রাইভারকে বললাম,- "ভাই, টর্চ আছে গাড়িতে?" উনি কোনো কথা না বলেই, গাড়ি থেকে একটা টর্চ বের করে দিলেন।

সূরা ফাতিহা আর সূরা এখলাস মনে মনে পড়তে লাগলাম। টর্চ নিয়ে গাড়ির পেছন দিক দিয়ে একটু সামনে এগুলাম। ভয়ে পা দু'টো পেছনে টানে শুধু। তবুও সামনে এগিয়ে যাচ্ছি।

কিছু দূর এগুনোর পর পাতার মড়-মড় একটা আওয়াজ শুনলাম এবং আমার সামনে একটা মানুষের ছায়া ভেসে উঠলো। ছায়াটার দিকে টর্চ ধরে দেখি,-এটা আমার খালার ছায়া, খালা মূর্তির মত সোজা হেঁটে জঙ্গলের ভেতরে যাচ্ছে।" ভয়ে শরীরটা ঝাঁকি দিয়ে উঠে। আমি নির্বাক হয়ে গেলাম। কোথায় যাচ্ছে খালা?

সাহস করে মা'কে ডাক দিলাম,- 'মা, খালাকে পাইছি, ড্রাইভারকে নিয়ে আসো তাড়াতাড়ি।" ড্রাইভারের মনটাও তাঁর পোশাকের মত সাদা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উনিও দৌড়ে আসলেন।

ড্রাইভার এগিয়ে আসায় সাহস পেলাম একটু।
আমি দৌড়ে খালার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। খালা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে ভয়ঙ্কর কণ্ঠে বললো,-"সরে যা অয়ন, সরে যা বলছি।"
আমার পা কাঁপতেছে, তবুও সাহস করে বললাম,-"না, আমি তোমাকে রেখে যাবো না।"
খালা রেগে বলতেছে,-"আমাকে নিয়ে যেতে চাইলে তকেও মরতে হবে আমার সাথে। বাঁচতে চাইলে চলে যা।"
খালার এই অবস্থা দেখে মা কাঁপতে কাঁপতে পড়ে যায়, আবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। ড্রাইভার মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। উনিও ভয়ে এগুতে পারছে না আর। আমি সাহস করে খালার হাতটা ধরলাম।
খালাকে নিজের দিকে টেনে কান্না স্বরে বললাম,-"খালা দয়া করে আমাদের সাথে চলো। তুমি না গেলে মা মরে যাবে, যেও না খালা। দেখ, মা অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেছে।"
খালা আমার কোনো কথাই শুনছে না, সামনে এগিয়ে যাইতেছে। আমি সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে পিছে টানতেছি খালাকে, খালা আমাকে ছেঁচড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

খালার গায়ে প্রচুর শক্তি। আমি যেন একটা পুতুল উনার কাছে।

কিছুক্ষণ যাওয়ার পর-
আমার হাতটা ধীরে ধীরে পিচ্ছিল হয়ে যাচ্ছে। খালার হাত থেকে আমার হাত ছুটে যাচ্ছে।

এইভাবে আরেকটু যাওয়ার পর, খালার শরীরটা দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেকটা আমার দিকে হেলে পড়তে থাকে। আমি খালাকে ধরে আস্তে আস্তে মাটিতে শুয়ালাম। মুখ দিয়ে আবার পূর্বের মত ফেনা বের হতে থাকে। গায়ে হাত দিয়ে দেখি উনার শরীরটা সাবানের মত পিচ্ছিল। তাৎক্ষণিক ঠান্ডাও হয়ে যাচ্ছে।
কিছু বুঝে উঠতে পারছি না।

'অশরীরীর ভর কি ছেড়ে দিয়েছে খালাকে?'- মনে মনে ভাবছি।

তখন আমার সামনে বিশাল আকৃতির একটা মানুষের ছায়া ভাসে। ছায়ার নিচে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন সব। ধোঁয়ার ভেতর থেকে ভয়ানক আওয়াজ আসে।
বলে,-"ভাগ্য ভালো তোদের, বেঁচে গেলি আজ।"

আমি ভয়ে কাতর হয়ে গেছি। চোখ দু'টো বন্ধ করে মাটিতে পড়ে রয়েছি। চোখ খুলে তাকানোর সাহস পাচ্ছিলাম না।

খানিক সময় বাদেই আল্লাহর নামের ধ্বনি শুনে চোখ খুললাম। পরপরই, ফজরের আযানের ধ্বনি শুনা যাচ্ছে। বুঝতে পারলাম, আল্লাহ স্বয়ং উসিলা হয়ে বাঁচালো আমাদের।
ড্রাইভারকে ডেকে বললাম, -"ভা-ই, তাড়াতাড়ি এদিকে আসো। খালাকে ধরো।" খালার শরীর অত্যন্ত পিচ্ছিল। দু'জনে পালকি বানিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। খালার শরীরটা এত পিচ্ছিল, ধরে নিয়ে যাওয়া যাচ্ছিল না। কয়েকবার হাত পিছলে পড়ে যাই। অনেক কষ্টে গাড়িতে নিয়ে তুললাম।

খালাকে রেখে গাড়ি থেকে একটা পানির বোতল নিয়ে দৌড়ে আবার মায়ের কাছে আসলাম। মায়ের মুখটা দেখে বুকটা ফেঁটে যাচ্ছিল আমার। আমার কলিজার টুকরা মা'টা ভয়ে জ্ঞান হারিয়ে জঙ্গলে পড়ে আছে। এমন নির্মম দৃশ্য কোনোদিন দেখবো, জীবনেও কল্পনা করিনি।

মায়ের নাকের দুই পাশে চাপ দিয়ে ধরলাম, জ্ঞান ফিরানোর জন্য। বেশিক্ষণ ধরে রাখতে ভয় করছিল, যদি শ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু তাতে জ্ঞান ফিরলো না মায়ের। আমি পাগলের মত অস্তির হয়ে গেছি।
তখন ড্রাইভার বললো, -'ভাই, তুমি সরে যাও, আমি দেখতেছি।'
উনি বোতল থেকে পানি নিয়ে মায়ের মুখে দূর থেকে ছুড়ে মারলেন।
কয়েকবার পানি মারার পর মা বিড়-বিড় করে একটু তাকায়। তাকিয়েই, 'অয়ন অয়ন' বলে ডাকতে থাকে।
মা'কে জড়িয়ে ধরলাম আমি।
-'এই তো মা, তোমার অয়ন আমি।'
মা অসহায়ের মত আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আমার চোখ দিয়ে অঝরে পানি পড়তেছে। নিষ্ঠুর খুদা কত কঠিন সময়ের সম্মুখীন করে দিল আমাদের।

-'অয়ন, তাড়াতাড়ি চলো, গাড়িতে তোমার খালা একা।'-ড্রাইভার ভাই বললেন।

-'জ্বী ভাই, চলেন। আপনার ঋণ আমার জীবন দিয়েও শোধ করতে পারবো না।'

মা হাঁটতে পারছিল না। ধরাধরি করে মা'কে নিয়ে তাড়াতাড়ি গাড়িতে তুললাম।

এক বোতল ফ্রেশ পানি দিলো ড্রাইভার, মা'কে খাওয়ানোর জন্য। উনার ব্যবহারে আমি মুগ্ধ।
পানিটা খাওয়ানোর পর মা একটু স্বাভাবিক হয়।

-'ভালো মানুষ যে এই পৃথিবীতে এখনো আছে, উনি তার দৃষ্টান্ত।' -মনে মনে আমি ভাবছি।

গাড়ি টান দিলেন, গর্ত থেকে এখন গাড়িটা অনায়াসেই উঠে পড়ে। ভোর হয়ে আসতেছে। ভোর বেলায় ডাকে এমন পাখির ডাক শুনা যাচ্ছে।

আমি মাথা নিচু করে ভাবছি,-'খালার উপর ভর করা অশরীরী আত্মা খালাকে কিভাবে মারতে চাইছে?
জঙ্গলে নিয়ে যাচ্ছিল কেন? খালা কি আগরাতে ওদের বড় কোনো ক্ষতি করেছিল?
জানিনা, আল্লাহ এর শেষ কোথায় রেখেছেন।'

ভাবতে ভাবতে সকাল হয়ে গেল। জঙ্গল থেকে বেরিয়ে হাওড়ের মাঝপথ দিয়ে একটা সরল রাস্তায় উঠেছে গাড়ি।

ড্রাইভার কে বললাম,-'আর কতটুকু সময় লাগবে ভাই?'
-'পনেরো মিনিটে পৌঁছে যাবো।

-'ইমার্জেন্সিতে ডক্টর পাওয়া যাবে না এখন?'

-'অল টাইম ডক্টর আছে। চিন্তার কিছু নেই।'-ড্রাইভার বললেন।

উনার কথা শুনে মনটায় একটু সাহস পেলাম।
খালার পা গুলো অনেক ঠান্ডা হয়ে গেছে। যে কোনো রোগির পা ঠান্ডা হওয়া ভালো লক্ষণ নয়।

গাড়ির সামনের কাচ দিয়ে তাকিয়ে দেখি, 'নিশিডাক মেডিকেল কলেজ হাসপাতল' লেখাটা। তার মানে চলে আসছি আমরা। কি ভয়ানক ভবন। চারপাশে বড় বড় গাছ। পুরাতন নিদর্শনের মত লাগছে দেখতে। ছয় তলা ভবনের একটা রাউন্ডে পুরো মেডিকেলটা। একটা বটগাছ পুরো হাসপাতালের উপর ছাতার মত ছড়িয়ে আছে। গাছটা অদ্ভুত লাগে দেখতে। এত বড় গাছ আগে দেখিনি আমি।

গাছটার উপরের দিকে তাকিয়ে ভয় পেয়ে যাই আমি। একটা শকুন বিশাল আকৃতির, এম্বুল্যান্সটার দিকে নজর করে বসে আছে।
শুকুন এমনিতেই ভয় পাই আমি। সাথে সাথে দৃষ্টি নামিয়ে আনি গাছ থেকে।

ভেতর থেকে একটা ট্রলি আনি গিয়ে। ট্রলিতে খালাকে তুলে মা আর আমি ঠেলে নিয়ে যাচ্ছি ইমার্জেন্সি হলে।

ডক্টর খালাকে দেখে বলতেছে,-'ও মাই গড! সি ইজ এ সিরিয়াস প্যাশেন্ট।'
উনি, তুলা দিয়ে খালার নাক-মুখ মুছলেন। দু'টো ইঞ্জেকশান দিলেন।
রোগী ভর্তি শিটে আরও কিছু ঔষধ লিখে পাঁচ তলায় মহিলা ওয়ার্ডে নিয়ে যেতে বললেন।

আমি একজন ওয়ার্ড বয়ের সহযোগিতায় খালাকে পাঁচ তলায় নিয়ে যাই।
গিয়ে দেখি- অনেক বড় ওয়ার্ড, কিন্তু তেমন রোগী নেই। দুই তিন বেড পর পর একটা রোগী, এমন।

১৫ নাম্বার বেডে খালাকে শুয়ালাম। একটা নার্স আসলো প্রায় ছয় ফিট উচ্চতার। আমি দেখে অবাক! উনি ভর্তিশিট দেখে আরেকজন নার্সকে তাড়াতাড়ি একটা নর্মাল স্যালাইন আনতে বললেন।

ক্যানুলার মাধ্যমে খালাকে স্যালাইন দেওয়া হলো। মা আর আমি পাশে বসে আছি।
মা বলতেছে, তোর খালুকে একটা ফোন দিয়ে সব বল। পরে যদি কিছু হয়ে যায়, কি জবাব দিব?

মায়ের কথা শেষ হতেই কানে ফোন ধরলাম আমি।
খালার স্বামীকে ফোন দিলাম। উনি ঢাকায় একটা মাল্টিন্যাশনাল কম্পানিতে চাকুরী করেন। ফোন পেয়েই উনি বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেলেন।

ফোনটা রেখে আমি নার্সটার কথা ভাবছি।
-'নার্সটা যেমন লম্বা তেমন ফর্সা। চোখ গুলো লালচে বড় বড়।' সুন্দর বাট ভয়ানক।

বেলা দশটা বাজে, কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছে রাত। দিনের আলো তেমন আসেনা ভেতরে।
খালার বেডে বসা আমি। হঠাৎ আমার দৃষ্টি দরজায় থাকা সাদা কাপড়টায় আটকে যায়। মনে হচ্ছে সাদা পর্দাটার পিছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। মহিলা হবে সম্ভবত। কিন্তু মুখটার সামনে চুল গুলো মুখটা ঢেকে রেখেছে। গায়ের পশমগুলো আমার দাঁড়িয়ে যায়। সাহস করে আমি দরজার দিকে এগিয়ে যাই। কাছাকাছি যাওয়ার পর মেয়েলি কণ্ঠে আগের সেই 'হিহিহি' হাসিটা কানে আসে। ভয়ে আর পা'টা সামনে নিয়ে যেতে পারিনি। ভাবলাম, নার্স আসলে নার্সকে নিয়ে দেখবো।

একটু পর ক্যাবিন থেকে নার্স বের হলো। আমি বললাম,-'সিস্টার, কেউ যেন আমাকে দরজার ওপাশ থেকে ফলো করতেছে, কিন্তু ভেতরে আসছে না। একটু দেখবেন এসে?'

-'কোথায়? চলেন তো দেখি।'
নার্স গিয়ে পর্দাটা উল্টে-পাল্টে দেখলো, কিন্তু কিছুই পেল না।

-'এই মাত্র এখানে দাঁড়িয়ে ছিল। চুল গুলো মুখের সামনে হেলে ছিল।'

-'এসব আপনার মনের ভুল। আর এই হাসপাতালে অদ্ভুত কিছু ঘটে, তাতে কান দিবেন না। সমস্যা হলে আমাকে ডাকবেন।'-নার্স বললো।

-'ঠিক আছে' বলে খালার কাছে চলে গেলাম আমি।'
খালা শান্তিতে ঘুমুচ্ছে। স্যালাইনের ভেতর আবার ইঞ্জেকশান দিয়ে গেলেন নার্স।

আমাদের পাশের কয়েক বেড পরে আরও কয়েকজন মহিলা রোগী।

বামপাশের বেডের মহিলাটা তাঁর রোগীকে রেখে ওয়াশরুমে গেছেন। উনার প্যাশেন্টেরও স্যালাইন চলছে।
মহিলা ওয়াশরুমে ডুকতেই, ঐ রোগীটার খিঁচুনি শুরু হয়ে যায়। স্যালাইনের পাইপটা ছিড়ে দূরে পরে যায়। আমি ভয়ে রোগীর কাছে না গিয়ে নার্স কে ক্যাবিন থেকে ডেকে আনলাম।

নার্স এসে দেখে- প্যাশেন্টার জিহ্বা বের হয়ে রক্তকরণ হচ্ছে। উনি হারি আপ ডক্টরকে ডেকে আনলেন।
ডক্টর এসে রোগী দেখে মৃত ঘোষণা করলেন। আমি পাশে দাঁড়িয়ে বোবা হয়ে গেছি।
'এটা কোথায় আসলাম? এ যে দেখি মৃত্যুর কারখানা।

রোগীর মাথার কাছে জানালার পর্দাটা নড়তেছে বিনা বাতাসে, একটা লম্বা হাত বেরিয়ে গেছে পর্দার ফাঁক দিয়ে। ডাক্তারকে বললাম, স্যার এই হাতটা কার? দেখার সাথে সাথে শরীরের পশম গুলো দাঁড়িয়ে উঠে আমার।
ডাক্তার বললো, -'কিসের হাত?'

মনে মনে ভাবছি,-'জঙ্গলের চেয়ে ভয়ানক এই মেডিকেল। আমি পাগল হয়ে যাবো এখানে থাকলে।'

খালার কাছে গিয়ে বসছি। একচুলও সরিনাই সারাদিন। পেটে খিদা লাগছে। হাসপাতার থেকে দুইটা ডিম আর এক হালি কলা দিয়ে গেছে। মা আর আমি তাই খেলাম।

খাওয়ার পর মা একটু ঘুমুচ্ছে। আমি পাশে বসে মাথা হাতিয়ে দিচ্ছি মায়ের।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেছে। হাপাতালটা ক্রমেই অন্ধকার হয়ে আসতেছে। একটা ভয়ের পাহাড় এসে আমার ভেতর ডুকতেছে। দরজা জানালার পর্দাগুলো আরও ভয়ানক লাগছে।

আমি হাঁটু গুলো আওজিয়ে মাথাটা হাঁটুর ভাজে ডুকিয়ে মায়ের পাশে বসে আছি। তখন লম্বা কণ্ঠে একটা আওয়াজ আসলো।
-'অ-য়ন'
কে যেন ডাক দিল আমাকে। আমি ভয়ে মাথা তুলতে সাহস পাচ্ছি না।

আবার ভয়ানক স্বরে বললো,-'বাবা অয়ন, এদিকে দেখো কে আসছি!

চলবে...


বিঃদ্রঃ একটি কমেন্ট করে রাখুন,
পরবর্তী পর্ব পোস্ট করা হলে
,কমেন্টে রিয়েক্ট দিলে নোটিফিকেশন পাবেন,
10 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই

সকল পর্ব