নিশিডাক মেডিকেল

নিশিডাক মেডিকেল
#গল্প- 'নিশিডাক মেডিকেল'
কলমেঃ- সাদিকুল ইসলাম
পর্ব-২

মধ্যরাত। খালার সাথে সাথে মা'য়েও জ্ঞান হারিয়ে ফেললো। আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম! এম্বুল্যান্সের আওয়াজ শুনা যাচ্ছে অনেক্ষণ ধরে, কিন্তু এতক্ষণে তো গাড়ি চলে আসার কথা, আসছে না কেন? এটা কি আদৌ এম্বুল্যান্সের শব্দ!?
মা কে অজ্ঞান দেখে আমার শরীরটা দুর্বল হয়ে গেছে। ভয়ে আর আতঙ্কে বুক ধড়-ফড় করতেছে। বাহির হয়ে যে পাশের বাড়ি থেকে কাউকে ডেকে আনবো সেই সাহসটুকু আমার মাঝে নেই। কিন্তু যে করেই হোক মায়ের জ্ঞান ফেরাতে হবে।

কলসি থেকে এক বোল পানি নিলাম। মা কে সোজা করে শুয়ে মাথার নিচে একটা কাগজ দিয়ে কিছুক্ষণ পানি ঢাললাম। কিন্তু তাতেও জ্ঞান ফিরতেছে না। কি যে করি!? বুঝে উঠতে পারছি না! মাথায় কিছু ধরছে না। হঠাৎ, মাথায় একটা বুদ্ধি আসলো,-'মুখে পানি ছিটকে দিলে তো জ্ঞান ফিরে৷ আসে অনেক সময়।' তাড়াতাড়ি ফ্রিজ থেকে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি নিলাম। পানি হাতের মুঠো করে নিয়ে মায়ের মুখে ছিটকে ছিটকে মারলাম। পাঁচ-ছয়বার পানি মারার পর মা আস্তে আস্তে চোখ খুললো। মায়ের জ্ঞান ফিরে আসায় আমি একটু সাহস পেলাম। জ্ঞান ফিরার পর'ই মা খালার কথা জিজ্ঞেস করতেছে, "খালাকে হাসপাতালে নিয়ে গেছি কি-না।" আমি বললাম,-"কিভাবে নেবো? তুমি তো জ্ঞান হারিয়ে পড়ে আছো। আমি ক'জনকে নিয়ে যাবো!?"
এই কথা বলে আমি খালার গায়ে হাত দিলাম। হাত দিয়ে দেখি, 'খালার শরীর অনেক ঠান্ডা হয়ে আসতেছে।' আমি খুব ভয় পেয়ে যাই। খালাকে বাঁচাতে পারবো তো? এম্বুল্যান্সটা যে এখনো এলো না। মা খালাকে জড়িয়ে ধরে আবার কান্না শুরু করে দিলো। আমার চোখের পানিও ধরে রাখতে পারছি না। মা ছেলে মিলে অসহায়ের মত গভীর রাতে কেঁদে যাচ্ছি।
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো!- কান্নার আওয়াজের মাঝে কে যেন হেসে উঠে প্রায়ই। 'হি হি হি' করে চিকন কণ্ঠের একটা হাসি। মা হাউ-মাউ করে কাঁদার কারণে শুনতে পায়নি। ভয়ে আমার কান্না থেমে গেছে। এমন অদ্ভুতভাবে হাসছে কে?
এরি মধ্যে আমার ফোনের রিং বেজে উঠলো। ফোন হাতে নিয়ে দেখি এম্বুল্যান্সের ড্রাইভার ফোন করেছে। তাড়াতাড়ি রিসিভ করে বললাম,-"ভাই, আপনাকে কখন ফোন করছি আমি, আপনি এখনো আসেননি কেন?"
উনি বলতেছে,-"ভাই, জঙ্গলের রাস্তা দিয়ে আসতে তিন বার আমার গাড়ি খারাপ হয়ে যায়। ভাগ্যিস নিজে গাড়ির কাজ জানি তাই ঠিক করে আসতে পারছি। আপনি ঘর থেকে বের হন। আমি রাস্তার মোড়ে গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি।"
আমি বললাম,-'ওকে ভাই, আমি আসতেছি।'
মা'কে বললাম,-"এম্বুল্যান্স আসছে, আমি এগিয়ে নিয়ে আসি।"
মা বলতেছে,-"আমিও তোর সাথে যাবো বাবা। তরে একা যেতে দিব না।"
মা'কে বললাম,-"তুমি গেলে খালার পাশে কে থাকবে? খালার অবস্থা ভালো না। তুমি ঘরে থাকো।"
আমার কথা শুনে মা, খালার পাশে আবার বসে পড়ে। আমি ঘর থেকে বের হলাম। ঘরের বাহিরে পা রাখার সাথে সাথে কানে 'হি হি হি' করে হাসির একটা শব্দ আসে। যদি বিশ্বাস করেন, হাসির আওয়াজটা শুনে শরীরের পশমগুলো দাঁড়িয়ে উঠে আমার। ভয়ে হাঁটতে পারছি না। এত ভয়ানক রাত আমার জীবনে আগে কখনো আসেনি। চোখ বন্ধ করে মোড়ের দিকে একটা দৌড় দিলাম। দৌড়াচ্ছি আর মনে হচ্ছে কে যেন আমার মাথার উপরে দাঁত খেলিয়ে খেলিয়ে হাসছে, 'হিহিহি' করে। মনে মনে ভাবছি, যত ভয়'ই দেখাক না কেন, খালাকে নিয়ে হাসপাতালে যেতেই হবে। তা না হলে খালা বাঁচবে না।
দৌড়ানো অবস্থায় সামনে তাকিয়ে দেখি, একটা সাদা গাড়ি, একটু একটু দেখা যাচ্ছে। দৌড়িয়ে একেবারে গাড়ির কাছে গিয়ে থামলান। ভেতরে সাদা পোশাক পরিহিত একজন ড্রাইভার বসা। গাড়ির কাছে যেতেই উনি দরজাটা খুলে দিলেন। গাড়িতে উঠেই বললাম,-"তাড়াতাড়ি ডানের রাস্তা দিয়ে চলেন ভাই।" উনি গাড়ি টান দিলেন। উনার গায়ে কাফনের কাপড়ের মত পোশাক। দেখতে অত্যন্ত ভয়ানক লাগছে। সাহস করে বলেই ফেললাম,-"আপনার গায়ে এমন পোশাক কেন ভাই?"
উনি বললেন,-" মৃত-অর্ধমৃত লাশ আনা নেওয়া করাই আমার কাজ। রাতবিরেতে কত জায়গায় যাই। কখন যে আমি লাশ হয়ে পড়ি কে জানে!? মৃত্যুর পর যেন কাফনের কাপড়ের অভাব না হয় সে জন্য এই পোশাক।"
আমি উনার কথার কোনো উত্তর দিলাম না। মনে মনে ভাবতেছি,- 'খালার শরীরটা যে ঠান্ডা দেখে আসছি, আল্লাহ'ই জানে বেঁচে আছে কি-না।' মা'য়ের সাথে কি হচ্ছে কে জানে! আমি ড্রাইভারকে বল্লাম,-"ভাই, একটু তাড়াতাড়ি চলেন।" উনি গাড়ির গতি ৬০+দিলেন, তবু গাড়িটা ধীর গতিতেই চলছে কোনো রকম। ড্রাইভার বলতেছে,-"ব্যাপারটা বুঝতেছি না! আজকে হলোটা কি! গাড়িটা জঙ্গলের ভেতর ডুকার পর থেকে এমন স্লো হয়ে গেল কেন? এই গতিতে গাড়ি তো পাখির মত চলার কথা। আমার মনে হচ্ছে ভৌতিক কোনো প্রভাব পড়ছে গাড়ির উপরে। মনে হচ্ছে সম্পূর্ণ গাড়িটা কেউ চেপে ধরে রাখছে।"
আমি ড্রাইভারের কথার কোনো উত্তর দিলাম না। উনি সব জেনে গেলে হয়তো গাড়ি নিয়ে ফিরে যাবেন।
দেখতে দেখতে গাড়ি ঘরের সামনে চলে আসে। আমি গাড়ির দরজা খুলেই এক দৌড়ে ঘরের ভেতর গেলাম। গিয়ে দেখি, খালা মৃত লাশের মত পড়ে আছে। মা পাশে বসে কয়েকটা আপেল আর কমলা কাটতেছে। মা'কে বললাম, -"এই ফল তুমি পেলে কই?" মা অবাক হয়ে বললো,-"ওমা! তুই তো একটু আগে দিয়ে গেলি আমাকে। এগুলো দিয়ে বললি,-"তুমি কেটে খাও, আর বাকিগুলো হাসপাতালের জন্য রেডি করো। হাসপাতালে গিয়ে বাহিরের জিনিস খাওয়া যাবে না।" তারপর গাড়ি আনতে চলে গেলি। তোর মনে নেই?
মায়ের কথা শুনে মাথা দিয়ে ঘাম ছিটকে পড়তেছে আমার। চুপ করে দাঁড়িয়ে ভাবতেছি,- 'এসব কি হচ্ছে? আমি তো গাড়ির জন্য দৌড়াচ্ছিলাম, এই ফাঁকে কে আসলো মায়ের কাছে?'
'না না, মাকে এসব বুঝতে দেওয়া যাবে না। মা যদি জানে এই ফলগুলো আমি দিয়ে যাইনি, আমার ছদ্মবেশে অশরীরী ভূত আসছিল মায়ের কাছে, তাহলে মা নিশ্চিৎ হার্ট এ্যাটাক করে মারা যাবে।
শরীরটা আরো দুর্বল হয়ে গেছে আমার। মুখ দিয়ে কথা আসছে না আর। মা ফল গুলো কেটে বোলে রাখছে। খুব তরতাজা ফল। ফলগুলোর দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখি, ছোট মাছের পোনার মত কাটা ফলগুলো নড়তেছে। বুকটা কেঁপে উঠে আমার! সেখান থেকে একটা আপেলের ফালি নিয়ে মা মুখে দিতে যাচ্ছে! আমি দেখেই, তাৎক্ষণিক মায়ের হাত থেকে আপেলের ফালিটা টান দিয়ে নিয়ে বোল সহ বাহিরে ঢিল ছুড়ে ফেলে দিলাম সব।
মা অবাক হয়ে বললো,-" কিরে একি করলি! ফেলে দিলি কেন?"
মা'কে বললাম,-" একদম চুপ! কোনো কথা বলবা না। খালাকে তাড়াতাড়ি গাড়িতে তুলতে হবে। ড্রাইভার ভাই, একটু আসেন।"
ড্রাইভারকে নিয়ে ধরাধরি করে এম্বুল্যান্সে তুললাম। খালাকে গাড়িতে তুলে, মনে একটু সন্দেহ আসলো আমার,-'ফলগুলো কি পড়ে আছে এখনো?' ফোনের টর্চ অন করে দরজার সামনে গিয়ে দেখলাম ফলগুলো আছে কি-না? কই! কিচ্ছু নেই। সারা উঠোন খোঁজে ফলের কোনো ছিটেফোঁটাও পেলাম না। বোলটা পড়ে আছে শুধু। এত রহস্যজনক ব্যাপার আগে কখনো আমার সাথে ঘটেনি।
হয়তোবা মায়ের কোনো ক্ষতি করতে চাইছিল এই ফল দিয়ে। আল্লাহ বাঁচিয়েছে। গাড়ি থেকে ড্রাইভার বলতেছে,-"ভাই, তাড়াতাড়ি আসেন।"
ঘর থেকে একটা লম্বা চাদর নিয়ে তাড়াতাড়ি গাড়িতে গিয়ে উঠলাম। এম্বুল্যান্সের ভেতরে রোগী রাখার একটা লম্বা সিট আছে, সেটাতে শুয়ায় রাখা হয়েছে খালাকে। মা আর আমি খালার পাশে বসে আছি। ড্রাইভার একা সামনে বসে গাড়ি চালাচ্ছে। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলাম 'তিনটা পয়তাল্লিশ' বাজে। একেবারে নিশি লাগার সময় এটা। খালার শরীরে হাত দিয়ে দেখি মৃত মানুষের মত ঠান্ডা হয়ে আছে শরীর। তবে মারা যায়নি, 'আমার মন বলছে।' মা অল টাইম জিকির করে যাচ্ছে- 'আল্লাহ্, আল্লাহ্ আল্লাহ্।'
এইভাবে অনেকটা সময় সামনে এগুনোর পর হঠাৎ গাড়িটা থেমে গেলো। বললাম,-" কি হলো ভাই?" উনি বললো, -"রাস্তার মাঝে কি যেন একটা পড়ে আছে। দাঁড়াণ, দেখতেছি।"
উনি গাড়ি থেকে নামলেন। একটু সামনে এগিয়ে গিয়ে বললেন, -"এই রাস্তায়৷ আর যাওয়া যাবে না, ভাই। অনেক বড় একটা গাছ উপড়ে পড়ে আছে রাস্তার মাঝে।"

আমি বললাম,-'এখন কোন পথে যাবেন তাহলে?'

-'ভেতর দিয়ে আরেকটা পথ আছে। সে পথে যেতে হবে।
-'ঠিক আছে, তাড়াতাড়ি চলেন ভাই।'

গাড়ি ঘুরিয়ে ভেতরের রাস্তা দিয়ে যাত্রা শুরু করলাম আমরা। ভেতরের রাস্তাটা জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে গেছে। আমার মাথায় একটা জিনিস কাজ করছে না,- 'ঝড়-তুফান ছাড়া এত বড় গাছটা গোড়া থেকে উপড়ে পড়লো কিভাবে!?'
যাই হোক, এমন অনেক প্রশ্নের উত্তর'ই আজ আমার কাছে নেই। মাথা নিচু করে এসব'ই ভেবে যাচ্ছি শুধু!...
হঠাৎ মা, 'অ-য়ন' বলে চিৎকার দিয়ে উঠলো।
-'কি হলো মা?'
-'দেখ, তোর খালা আমার দিকে চোখ বড় বড় তাকাচ্ছে।'
আমি তাকিয়ে দেখি, খালা মৃত মানুষের মত ঘুমুচ্ছে। মা'কে বললাম,-"এটা তোমার মনের ভুল।"
মা'কে কোনো রকম সাহস দিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। মা আমাকে জড়িয়ে ধরে রাখছে। ভয় পেয়েছে অনেক।

কিছু দূর যেতেই আবার গাড়িটা কাঁদে আটকে পড়ে। হায়রে বিপদ! ড্রাইভার গাড়ি থেকে নামে। আমাকেও নামতে বলে, ধাক্কা দেওয়ার জন্য। উনি সব দেখে গাড়িতে উঠে, আর আমাকে বলে, -'ধাক্কা দেন সজোরে।'
ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট করে, আমি ধাক্কা দিচ্ছি, কিন্তু গাড়ি নড়ছে না একটুও। অবশেষে মা'কেও নামতে হলো। প্রাণ-পন চেষ্টা করার পরও গাড়ি এক চুল পরিমাণ সরাতে পারিনি আমরা। ড্রাইভার একটু ভয় পেয়ে যায়। আমাকে বলতেছে,-'এমন তো হওয়ার কথা না। গাড়ি এইটুকু কাঁদায় এভাবে আটকে পড়ার তো একদমই মানে হয়না না। কি যে হচ্ছে এসব!"
উনি গাড়ির চারপাশ ঘুরে দেখলেন আবার।'
দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন এবং বললেন,-" ভাই,গাড়ির চাকার নিচে কিছু দিতে হবে। ধেবে যাচ্ছে চাকাটা।" উনি গাড়ি থেকে ছোট একটা কোদাল বের করলেন। কোদাল দিয়ে উনি মাটি কেটে দিচ্ছে, আর আমি হাত দিয়ে মাটি চাকার নিচে দিচ্ছি। কিছুক্ষণ মাটি দেওয়ার পর, হঠাৎ করে মা দৌড়ে আসে পেছন থেকে। এসে বলে,-"গাড়ির পেছনের ঢালাটা আপনাআপনি খুলে যাচ্ছে।" আমি দৌড়ে গেলাম পিছন দিকে। গিয়ে দেখি, -'গাড়ির ঢালাটা উপরে উঠে আছে, খালা যে সিটে শুয়ে আছে সেই সিটটা খালাকে নিয়ে নিচের দিকে নেমে আসতেছে!.

চলবে...

বিঃদ্রঃ একটি কমেন্ট করে রাখুন,
পরবর্তী পর্ব পোস্ট করা হলে
,কমেন্টে রিয়েক্ট দিলে নোটিফিকেশন পাবেন,
9 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই

সকল পর্ব