সন্তান যখন আতঙ্কের নাম।

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
সন্তান যখন আতঙ্কের নাম
Writer: জাহিদা বেগম।

নাস্তা খেতে খেতে আমার মেয়ে রিমি হঠাৎ বলে উঠলো- জানো আম্মু আমাদের ক্লাসে মাহিন নামের যে ছেলেটা আছে, ওকে স্কুল থেকে বের করে দিয়েছে। কথাটা শুনেই আমি বিষম খেলাম। ছেলেটা আমার রিমির সাথে সবে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে, ওদের কিইবা এমন বয়স। আর কি এমন করেছে ছেলেটা যে তাকে স্কুল থেকে বের করে দিয়েছে?

নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম- কেনো মা, সে কি করেছে?

গত পরশুদিন পড়া না পারার কারণে স্যার ওকে মেরেছিলো। তাই সে রেগে গিয়ে, তার পাড়ার কিছু বন্ধুদের ডেকে নিয়ে স্কুলের সিসি ক্যামেরা ভেঙ্গে দিয়েছে। জানো মা, ওর বন্ধু গুলো কেমন যেনো। ঐ যে একদম গুন্ডাদের মতো দেখতে।

একথা শুনে বুকের ভেতর কেমন যেনো আঁৎকে উঠলো। এতটুকু ছেলে কি এমন বয়স হয়েছে তার। এখন তো তার হেসে খেলে চলার কথা। অথচ সে দিনদিন এমন উগ্র আচরণের হয়ে যাচ্ছে।

এই বয়সে শিশুদের চোখে কতরকমের স্বপ্ন থাকে, আশা থাকে, আকাঙ্ক্ষা থাকে, উচ্ছাস থাকে। কিন্তু ওর আচরণে কেবলই হিংস্রতা। চাহনিতে কোনো মায়া নেই।

বেশ কিছুদিন আগে রিমিকে স্কুলে দিতে গিয়ে ছেলেটাকে দেখেছিলাম আমি। সেদিনও তাকে নিয়ে বিচার বসেছিলো। ছেলেটার মা সেদিন খুব রিকোয়েস্ট করেছিলো স্যারকে, আরেকটা সুযোগ দেওয়ার জন্য।

কিন্তু এবার বোধহয় সেটাও গেলো।

রিমিকে রেডি করে ওর বাবার সাথে স্কুলে পাঠিয়ে দিলাম। আজ আমার আর যেতে ইচ্ছা করছে না। মন ভীষণ খারাপ হয়ে আছে। বারবার কেবল ছেলেটার চিন্তা মাথায় ঘুরছে।

ছেলেটার বাবা-মা চাকরিজীবী। তাদের গাড়ি আছে, বাড়ি আছে তবুও তারা দুজনে চাকরি করে। পর্যাপ্ত সময় ছেলেটাকে দেয় না। দিনের বেশিরভাগ সময় তাকে ঘরের আয়া-বুয়াদের সাথে থাকতে হয়। আচ্ছা বলুন তো বাবা-মা যদি সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় না দেয়, তবে এই সন্তানের সঠিক বিকাশ হবে কি করে?

বাবা-মা'র সঙ্গ না পেয়ে সন্তানেরা একাকীত্বে ভোগে। এরপর হুট করে কেউ সঙ্গ দিতে শুরু করলে সেটাকে আঁকড়ে তারা বাঁচতে চায়। তারা বুঝতে চায় না তার জন্য কে ভালো আর কে মন্দ। তারা কেবল সঙ্গী পেয়ে তাদের নিয়েই খুশি থাকতে চায়।

বেশ কয়েক মাস আগে রিমিকে স্কুলে দিতে গিয়ে, মাহিনের মায়ের সাথে আমার দেখা হয়েছিলো। সেদিনও ভদ্রমহিলাকে স্যারের রুমে বসে থাকতে দেখেছিলাম। রিমিকে ক্লাস রুমে দিয়ে আসার সময় ভদ্রমহিলাকে মুখ কালো করে স্যারের রুম থেকে বের হতে দেখলাম।

ভাবী কেমন আছেন? জিজ্ঞেস করতেই তিনি মুখ কুঁচকে জবাব দিলেন- আর বলবেন না ভাবী ছেলেটাকে নিয়ে আর পারছিনা। প্রতিদিন কোন না কোন বিচার তাকে নিয়ে আসবেই। কি যে করি আমি?

চাকরি, সংসার সবমিলিয়ে এতো ঝামেলা, এরপর যদি ছেলেটাও এমন করে তাহলে কিভাবে পারবো আমি?

আমিও হুট করেই বলে ফেললাম- চাকরিটা ছেড়ে দিলেই পারেন। হয়তো বাচ্চা আপনাদের কাছে সময় চাইছে।

ভদ্রমহিলা চেহারায় বিরক্তির ছাপ টেনে বললো- ওসব নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। আপনি আপনার কাজে যান।

এরপর আর উনার সাথে আমার দেখা হয় নি। সারাদিন মাথায় মাহিনের চিন্তা ঘুরপাক খেয়েছে, ওর মতো আমারো একটা সন্তান আছে কিনা। আজ সারাদিনে কোনো কাজই ঠিকমতো হয়নি। আসলে সত্যি বলতে, কোনো কাজ আমিই ঠিক করে করতে পারিনি।

সময় তার নিজ গতিতেই গড়িয়ে যাচ্ছে। দেখতে দেখতে কেটে গেলো প্রায় চার মাস। আজ ছুটির দিন। রিমি আর তার বাবা বায়না ধরেছে আজ খিচুড়ি আর গরুর মাংস ভুনা খাবে। আমিও নিত্যদিনের কাজের তাগিদে রান্নাঘরে চলে গেলাম।

ছুটির দিনে আমাকে রান্না ছাড়া আর কোনো কাজ নিয়ে চিন্তা করতে হয়না। রিমির বাবা আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করেন। ভদ্রলোকের ধৈর্য আছে বলতে হয়। আমি আর তার মেয়ে হলাম তার প্রাণ। আমাদের কিছু হলে ভদ্রলোক হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।

রান্না শেষে ফ্রেশ হয়ে এসে সবাই মিলে খেতে বসলাম। তখন রিমির বাবা বলে উঠলো- চলো আজ আমরা কোথাও ঘুরতে যায়। রিমিকেও বেশ আনন্দিত মনে হলো। আমি আর কি বলবো, এই মানুষগুলোর খুশিই তো আমার খুশি।

বিকালে বের হওয়ার জন্য রেডি হয়েছি, তখনি কলিংবেলের শব্দ। দরজা খুলতেই দেখি মাহিনের আম্মু দাঁড়িয়ে আছে। ভদ্রমহিলাকে দেখে বেশ অবাক হলাম। চুল গুলো কেমন উষ্কখুষ্ক, চোখের নিচে কালো দাগ, চেহারায় বিষন্নতা স্পষ্ট।

ভেতরে আসতে বললাম। বসতে বসতে তিনি জিজ্ঞেস করলেন- বিরক্ত করলাম না তো আবার? আমিও মুখে হাসির রেখা টেনে বললাম- না ভাবী ঠিক আছে, আপনি এসেছেন ভালো লাগছে আমার। এমনিতেই তো কথা বলার মানুষ পাইনা।

রিমিকে নিয়ে ওর বাবা চলে গেলো, আমার আর যাওয়া হলো না।

মাহিনের আম্মুকে জিজ্ঞেস করলাম আপনার কি অবস্থা? আপনার ছেলেটা কেমন আছে? প্রশ্ন শুনেই তিনি কেঁদে দিলেন।

আর বলবেন না ভাবী, ছেলেটাকে নিয়ে আমি আর পারলাম না। ওর জন্য আমি চাকরিও ছেড়ে দিয়েছি, কিন্তু লাভ হলোনা। আমার ভুল গুলো বুঝতে বড্ড দেরি হয়ে গেলো। আমার ছেলেটা আর ভালো নেই।

এই স্কুল থেকে বের করে দেয়ার পর তাকে আরেকটা স্কুলে ভর্তি করেছিলাম, সেখান থেকেও তাকে বের করে দিয়েছে।

আমাকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে তিনি নিজেই বলতে লাগলেন- নতুন স্কুলে ছাত্রদের সাথে মারামারি করে, স্কুলের ব্যাঞ্চ এবং ফ্যান ভেঙ্গে দিয়েছে। এখন তো এমন অবস্থা হয়েছে যে কোনো স্কুলেই তাকে নিচ্ছে না।

আজকাল সে আমাদের আলমারি থেকে টাকাও চুরি করে। গতকাল রাতে দেখলাম মোবাইলে খুব বাজে কিছু দেখছে, মোবাইলটা তার হাত থেকে কেড়ে নিতেই আমাকে মারার জন্য তেড়ে এসেছিলো। কি যে কষ্ট হচ্ছিলো ভাবি।

এসব নিয়ে প্রতিদিন মাহিনের বাবার সাথে আমার ঝগড়া হয়, সে এখন আমার গায়েও হাত তোলে। আমার ভুলে ছেলেটাকে আর মানুষ করতে পারলাম না আমি। সংসারে খুব অশান্তি চলছে ভাবি। আমার বোধহয় আর সংসার করা হবেনা বলেই তিনি খুব কাঁদতে শুরু করলেন। একপর্যায়ে আমাকে কিছু বলতে না দিয়েই তিনি উঠে চলে গেলেন। আমি সেখানে ঠাঁই বসে রইলাম।

মনের ভেতর প্রচন্ড ভয় কাজ করছে। বারবার আমার রিমির চেহারা চোখের সামনে ভাসছে। আপনাদের মনে আছে, ঐশীর কথা? তাকেও একা রেখে তার বাবা-মা প্রায়ই বাহিরে যেতো। খারাপ সঙ্গ তাকে কতোটা হিংস্র করে তুলেছিলো।

রাতের খাওয়া দাওয়ার পর সমস্ত কাজ শেষ করে রুমে ঢুকতেই, ঘুমন্ত রিমির দিকে আমার চোখ আটকে গেলো। অজানা ভয়ে আবার বুকের ভেতর তোলপাড় শুরু গেছে। রিমিকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করেছি আমি। জানিনা কেনো এতো ভয় লাগছে। রিমির বাবা বারবার জিজ্ঞেস করছে - কি হয়েছে তোমার? কাঁদছো কেনো?

কিন্তু না আমি কোনো উত্তর দিতে পারছি না, কেবল অঝোরে কেঁদেই চলেছি।

যে সন্তান পৃথিবীতে আসার আগেই বাবা-মা অজস্র স্বপ্ন বুনতে শুরু করে, বুকে অনেক আশা বাঁধে; একটুখানি অবহেলা, অযত্নে সেই সন্তানেরা কতোটা হিংস্র রূপ ধারণ করে। সন্তান ভালো হলে বাবা-মা কতো আনন্দিত হয়, সেই সন্তান খারাপ হলে বাবা-মা সর্বক্ষণ আতঙ্কে দিন পার করে।


এরকম আরো গল্পের জন্য এখুনি আমাকে ফলো করে রাখো।
122 Views
6 Likes
3 Comments
5.0 Rating
Rate this: