সাত ডাকাত আর হাতেম তায়ী

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
আর চোখ ঝলসানো হীরে-জহরত। বুড়ী বলে : শাহী দৌলত।

লুটতরাজ করে বুড়ীর সাত ছেলে যখন ঘরে ফেরে তখন তাদের চেহারা দেখে মনে হয়, সাত ভাই না সাতটা রাক্ষস। কারো কাপড় গেছে ছিড়ে; কারো গায়ে রক্তের ছোপ, কারো পিটে কালসিটে দাগ। ঝোড়ো কাকের পালকের মত আগোছালো তাদের মাথার চুল। সব মিলিয়ে তখন বিকট তাদের চেহারা।

বুড়ীর সাত ছেলে হুমহাম করে ডেরায় ফেরে। ডেরায় ফিরেই লুটতরাজের জিনিস-পত্তর তারা দুমদাম করে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। তারপর হাতের কাছে রুটি মিঠাই যে যা পায় তাই গপাগপ করে গিলে এক এক জন এক এক সুরাই পানি পান করে। আর একটু পরেই হাত-পা ছড়িয়ে গাছতলায় শুয়ে ভোঁস ভেঁস করে নাক ডাকিয়ে ঘুমায়।

শুকনো ঘাস পাতা আর লাকড়ি জ্বেলে বুড়ী তখন রান্না করতে বসে। রান্না শেষ হলে অনেক রাত্তিরে বুড়ী তখন ছেলেদের খেতে দেয়। দেয়ালের গায়ে কালো কালো ছায়া ফেলে তারা গোগ্রাসে খায়। আর খাওয়া দাওয়া শেষ হলে মস্ত বড় বড় হাই তুলে আবার। তারা ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমায় বেলা দুপুর পর্যন্ত! ঘুম থেকে উঠে আর এক দফা খেয়ে নিয়ে কেউ গল্প গুজব করে, কেউ মনের আনন্দে গান ধরে, কেউ ঘুরে বেড়ায় ফাঁকা ময়দানে। ডাকাতি, রাহাজানি করে আর লুটতরাজের মাল খেয়ে এইভাবে মহাশূর্তিতে তাদের দিন কাটে।

কিন্তু চিরকাল কখনো সমান যায় না। কেমন করে জানি সাত ভাই ডাকাতের কথা দুনিয়ায় ফাঁস হয়ে যায়। কেউ আর ভয়ে সেই ময়দানের তিন সীমানা মাড়াতে চায় না।

একদিন যায়, দুদিন যায়, হপ্তা যায়, মাস যায়, কেউ আর ময়দানের সীমা সরহদ মাড়ায় না। জমানো ঘি-আটা ফুরিয়ে যায়, টাকা কড়ি শেষ হয়। কিন্তু কোন মুসাফিরের পাত্তা মেলে না সেখানে। বুড়ীর সাত ছেলে সাতটা খ্যাপা মহিষের মত ঘুরে বেড়ায়। বুড়ীও খুব অস্থির হয়ে ওঠে। খসখস করে বুড়ী গা চুলকায় আর ঘ্যানর ঘ্যানর করে সেই একই কথা বলতে থাকে : কি হ’ল, কেউ আসছে না কেন? কেউ আসছে না কেন?

হঠাৎ একদিন পথের বাঁকে দেখা যায় শাহজাদার মত সুন্দর এক নওজোয়ানকে। বুড়ী চোখ কচলে দেখে। ঠিকই তো। যেমন চেহারা, তেমন লেবাস পোশাক! শাহজাদা না। হ’য়েই যায় না। কিন্তু শাহজাদা হ’লে একা কেন? সঙ্গে লোকলশকর নাই কেন? বুড়ী আপন মনে বিড়বিড় করে।

আসল কথাটা এই—

সাত সওয়ালের জওয়াব খুঁজতে যেয়ে শাহজাদা হাতেম তায়ী পথ হারিয়ে সেই ময়দানে। হাজির হল। হাতেমের পণ ছিল। কি পণ? -না তিনি আল্লাহর পিয়ারা সৃষ্টি মানুষের কাজে জান কোরবান করবেন। এ জন্যেই মানুষের কাজে তিনি দেশ দেশান্তর সফর করেন। এই রকম একটা সফরের পথেই দিশা হারিয়ে হাতেম সাত ডাকাতের ময়দানে হাজির হন।

ময়দানের পথ-ঘাট ঠিকমত চিনে নেওয়ার জন্যে হাতেম মানুষের খোঁজ করেন। কিন্তু মানুষ কোথায় ? শেষতক হাতেম দেখেন কি,–না থুথুরে এক বুড়ী, একটা বুড়ো পাখীর মত একলা সেই ময়দানে বসে আছে। মানুষ দেখে হাতেম তাড়াতাড়ি এগিয়ে যান আর বুড়ীর কাছে পৌঁছানোর সাথে সাথেই হাত বাড়িয়ে বুড়ী হাতেমের কাছে ভিক্ষা চায়। এই ফাঁকা মাঠে, বিরান, বেবাহা ময়দানে হাতেম যে মানুষের দেখা পাবেন একথা তিনি আগে ভাবতেই পারেননি। কাজেই বুড়ীকে দেখে তিনি খুব খুশী হন। আর বুড়ী যখন তাঁর কাছে সাহায্য চায় তখন হাতেম মনের খুশীতে দামী হীরার আংটিটি তাকে দিয়ে দেন।
1.53K Views
28 Likes
4 Comments
3.8 Rating
Rate this: